শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধে সরকারের বড় উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩১ বার
শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধে সরকারের বড় উদ্যোগ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী একটি সংবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে বর্তমান সরকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, হতাশা ও চরম মানবেতর জীবনযাপনের অবসান ঘটিয়ে একযোগে ৭৫ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারীর অবসর ভাতা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া অর্থ পরিশোধের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে একযোগে এই বিশাল অংকের অর্থ পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলার শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের কান্না ও আকুতির অবসান ঘটাতে সরকার এই খাতে দুই হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বিশেষ থোক বরাদ্দ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষা খাতের দীর্ঘ ইতিহাসে অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে এককালীন এত বড় অংকের অর্থ বিতরণ কর্মসূচি এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
গত ২০২২ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার বছর ধরে অবসর নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি বিশাল অংশ তাদের প্রাপ্য অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের একটি টাকাও পাননি। এই দীর্ঘ সময় ধরে লাখো শিক্ষক চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করেছেন। অনেকের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমানো সম্বলটুকু বিক্রি করতে হয়েছে, কেউ কেউ আবার প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেছেন। বার্ধক্যের এই ক্রান্তিলগ্নে যখন তাদের আরাম ও চিকিৎসায় কাটানোর কথা, তখন তাদের বারবার ঢাকায় এসে ফাইল হাতে নিয়ে বারান্দায় বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। শিক্ষকদের এই মানবেতর ও করুণ চিত্র গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে নীতিনির্ধারক মহলে। শিক্ষক সমাজ ও তাদের পরিবারের এই সীমাহীন দুর্দশা লাঘব করতেই প্রধানমন্ত্রী বিশেষ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা প্রদর্শন করে এই এককালীন অর্থ ছাড়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন যে, আগামী ১৫ আগস্ট রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একটি কেন্দ্রীয় আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শিক্ষা খাতের এই ঐতিহাসিক ও বহুকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ ছাড়করণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে একসাথে অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রায় ৭৫ হাজার অনিষ্পন্ন আবেদন পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, এই ৭৫ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী যুগপৎভাবে কল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সুবিধাও একযোগে লাভ করবেন।
প্রাথমিক হিসাবনিকাশ অনুযায়ী জানা গেছে যে, এই বিশেষ কর্মসূচির অধীনে প্রতিটি শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত একলপ্তে হাতে পাবেন। তবে চূড়ান্ত হিসাবের কাজ এখনও চলমান রয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিটি ফাইল নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করছেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ও আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে অর্থ প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে এই ধরনের অনুদান বা পাওনা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের দালালচক্র, মধ্যস্বত্বভোগী ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হতো শিক্ষকদের। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই ডিজিটাল ও সরাসরি ব্যাংক হিসাবভিত্তিক হস্তান্তরের সুবাদে কোনো প্রকার হয়রানি বা মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা বসানোর সুযোগ আর থাকছে না, যা শিক্ষক সমাজের মধ্যে একধরনের স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
তবে সরকারের এই বড় উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের একাংশের মধ্যে এখনো কিছু সুনির্দিষ্ট সংশয় ও জিজ্ঞাসা কাজ করছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, শিক্ষক ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে মূল বেতনের একটি অংশ কেটে রেখে এই তহবিল গঠিত হয়েছিল। মাস গেলেই শিক্ষকদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ হারে অবসর সুবিধার জন্য এবং ৪ শতাংশ হারে কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য টাকা কেটে রাখা হতো। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের আমলে আর্থিক অব্যবস্থাপনা, চরম অদূরদর্শিতা এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের দুর্বলতার কারণে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি ব্যাংক থেকে সরিয়ে বিতর্কিত কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, বর্তমানে দেশের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় এক হাজার সাতশ কোটি টাকার বেশি আটকে রয়েছে। সেই আটকে থাকা অর্থ সময়মতো পুনরুদ্ধার না হওয়ার কারণে এই তহবিলে নগদ প্রবাহের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা শিক্ষক সমাজকে দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্ব করে রেখেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী যখন দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিয়ে এককালীন ৭৫ হাজার শিক্ষককে পেমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন শিক্ষক নেতাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, তাদের মূল কেটে রাখা টাকা তো পরিশোধ করা হচ্ছে, কিন্তু বহু বছর ধরে ব্যাংকে আটকে থাকা সেই বিনিয়োগের লভ্যাংশ বা মুনাফার অংশটুকু তারা সঠিকভাবে পাবেন কি না। শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতারা বারবার দাবি জানিয়ে আসছেন যে, শুধু মূল টাকা নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বিধিমোতাবেক প্রাপ্য সম্পূর্ণ মুনাফাসহ পুরো অর্থই শিক্ষক-কর্মচারীদের বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। অন্যথায় বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এখনও লক্ষাধিক আবেদন সম্পূর্ণ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন আরও হাজার হাজার কোটি টাকা।
তবুও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ১৫ আগস্টের এই বিশাল অর্থ বিতরণ কর্মসূচিকে শিক্ষক সমাজ দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙার ক্ষেত্রে একটি সাহসী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শামসুর রহমান, রবিউল ইসলাম রবি কিংবা নাজমা আক্তারদের মতো লাখো মানুষের চোখের জল হয়তো এবার কিছুটা হলেও মুছতে শুরু করবে। বছরের পর বছর ধরে জুতোর তলা ক্ষয় করার দিনগুলোর অবসান ঘটিয়ে যখন সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জীবনের শেষ সম্বল বা দীর্ঘ সাধনার পাওনা জমা হবে, তা হবে তাদের জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই মহতী উদ্যোগ যেন কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই এখন প্রতিটি ভুক্তভোগী শিক্ষকের একমাত্র প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত