দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার
দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য ঘিরে ক্ষোভ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বসে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনটিতে ভারতের মাটিতে বসে পলাতক কোনো আসামির এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাওয়াকে কোনোভাবেই সহজভাবে নেয়নি বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় নিন্দা জানানো হয়েছে এবং এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি অবমাননা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সমস্ত প্রচেষ্টাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
গত বুধবার নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ষোল বছরের ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর প্রথমাবারের মতো প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সেই দিনটিতে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও সাজাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেন। নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও পরিণতির কথা চিন্তা না করে তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসটিকে দেশের ‘বিজয়ের মাস’ হিসেবে উল্লেখ করে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন যে, তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, তার প্রতিবাদে এবং জনগণের অধিকার আদায়ের তাগিদেই তাকে সব শঙ্কা তুচ্ছ করে দেশের মাটিতে ফিরে যেতে হবে। এছাড়া তার এই অনুষ্ঠানে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও বক্তব্য রাখেন এবং ভারতের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ভারতের মাটিতে বসে এমন একটি রাজনৈতিক সভা ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার ঢেউ ওঠে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এক কড়া ভাষায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন দণ্ডিত ও পলাতক গণহত্যাকারীকে নয়াদিল্লির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসে দেশের রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করার সুযোগ করে দেওয়া বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের কাছ থেকে কাম্য ছিল না। অতীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে নয়াদিল্লিকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই ধরনের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে দেওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ ও জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সঙ্গে একপ্রকার প্রবঞ্চনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। পাশাপাশি ঢাকাস্থিত কূটনৈতিক মহলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে বাংলাদেশের নিকট প্রত্যর্পণের জোরালো দাবি আবারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকার পক্ষ থেকে এমন চড়া কূটনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের পর ভারত সরকার এই ঘটনা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। নয়াদিল্লির বৈদেশিক মন্ত্রালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, এই সংবাদ সম্মেলন বা সভার আয়োজন করার সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা বা ভূমিকা ছিল না। কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি মাধ্যমের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যদি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করা হয়, তবে সেটির দায় ভারত সরকার বহন করবে না এবং ভারত তা আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনও করে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ঐতিহ্যগতভাবে এই ইস্যুতে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখার চেষ্টা চালালেও সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এদিকে রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কিত ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের ভেতরেও এর নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। ওই অনুষ্ঠানে সাবেক জাতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের একটি নির্দিষ্ট স্থানে সাকিবের পৈতৃক বা নিজ বাসভবনে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তদের পক্ষ থেকে অতর্কিতভাবে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করার চাঞ্চল্যকর সংবাদ পাওয়া গেছে। যদিও এই আকস্মিক হামলায় বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা আহতের ঘটনা ঘটেনি, তবুও রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তেজনার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং এই আকস্মিক হামলার নেপথ্যে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে নিবিড় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার এই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন এবং ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক গভীর ও গুরুতর ধাক্কা দিয়েছে। একদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো যখন দেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভিনদেশে বসে এমন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে। দেশের সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করছে যে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে যদি অটুট রাখতে হয়, তবে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং পলাতক অপরাধীদের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করার বিষয়ে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও কঠোর মনোভাব দেখাতে হবে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উত্তেজনা কোন মোড় নেয় এবং দুই দেশের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক কীভাবে স্বাভাবিক হয়, এখন সেদিকেই গভীর দৃষ্টি রয়েছে দেশবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত