ক্রেতা সেজে স্বর্ণ কিনতে গিয়ে ৫৭ লাখ জাল নোটসহ গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩১ বার
ক্রেতা সেজে স্বর্ণ কিনতে গিয়ে ৫৭ লাখ জাল নোটসহ গ্রেপ্তার
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে অপরাধের এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। স্বর্ণ কেনার নাম করে সুকৌশলে জালিয়াতি করার এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পুলিশের বুদ্ধিমত্তায় পণ্ড হয়ে গেছে। ক্রেতা সেজে বনানীর একটি প্রতিষ্ঠিত জুয়েলারি দোকানে প্রবেশ করে প্রায় ৫৭ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল নোট দিয়ে স্বর্ণালংকার ক্রয়ের চেষ্টা করছিলেন এক প্রতারক। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; দোকানদারদের সতর্ক দৃষ্টি এবং পরবর্তীতে স্থানীয় জনতার সহায়তায় মো. রুবেল আহম্মেদ ফকির (৪৬) নামের এক প্রতারককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই স্বর্ণ ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের আতঙ্ক ও সতর্কতা বিরাজ করছে, কারণ অপরাধীরা এখন অপরাধের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বনানী সুপার মার্কেটের ভেতরে অবস্থিত একটি স্বনামধন্য জুয়েলারি দোকানে এই রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। দিনটি অন্য দিনগুলোর মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু বিকেলের দিকে ঘটিত এই ঘটনা পুরো মার্কেটে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকেল আনুমানিক চারটার দিকে দুই ব্যক্তি ক্রেতার বেশ ধারণ করে অত্যন্ত সুচতুরভাবে ওই জুয়েলারি দোকানে প্রবেশ করেন। তাদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় কোনো সন্দেহ করার মতো অবকাশ ছিল না। দোকানে ঢোকার পর তারা দোকান কর্মচারীদের জানান যে তাদের কোনো এক নিকটাত্মীয়ের আসন্ন বিবাহ উৎসবের জন্য প্রায় কুড়ি থেকে একুশ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার কেনা প্রয়োজন। এই পরিমাণ স্বর্ণালংকার ক্রয়ের কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই দোকানের কর্মীরা তাদের বেশ গুরুত্ব সহকারে সেবা দেওয়া শুরু করেন এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় ডিজাইনের গহনা তাদের সামনে প্রদর্শন করেন।
দোকানের কর্মচারীদের দেওয়া বিভিন্ন ক্যাটালগ ও গহনা থেকে ওই দুই ব্যক্তি তাদের পছন্দমতো স্বর্ণালংকার বেছে নেন। গহনা পছন্দ করা শেষ হলে দোকানের পক্ষ থেকে মোট বিল তৈরি করা হয় এবং তা প্যাকিং করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই আসে মূল্য পরিশোধের পালা। অপরাধীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে তাদের সঙ্গে থাকা একটি ভারী কালো রঙের ট্রলি ব্যাগ থেকে বেশ কয়েকটি টাকার বান্ডিল বের করে দোকানের কাচের টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখেন। এত বিপুল পরিমাণ টাকা একসঙ্গে দেখার পর দোকানের কর্মচারীদের মনে এক ধরনের অদ্ভুত সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কর্মচারীরা টাকার বান্ডিলগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করার পর এবং খুব কাছ থেকে তা পর্যবেক্ষণ করার পর বুঝতে পারেন যে নোটগুলোর টেক্সচার, রঙ এবং নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক কাগজের নোটের মতো নয়।
সংশয় আরও ঘনীভূত হলে দোকান কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে টাকাগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সমস্ত সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হয়। কর্মচারীরা বুঝতে পারেন যে টেবিলের ওপর রাখা টাকার বান্ডিলগুলোর পুরোটাই জাল নোটের সমাহার। এই ভয়ঙ্কর সত্য বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নিজেদের প্রতারণা ধরে পড়ার বিষয়টি টের পেয়ে ওই দুই ব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে ঘাবড়ে যান এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দোকান থেকে দ্রুত দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তাদের এই হঠাৎ পালানোর উদভ্রান্ত চেষ্টা দেখে দোকানের ভেতরে ও বাইরে থাকা লোকজন এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। তারা সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসে দুই প্রতারকের একজনকে জাপটে ধরে আটকে ফেলতে সক্ষম হন, তবে চরম ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে তার অন্য এক সহযোগী সুকৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার তাৎক্ষণিক খবর দেওয়া হয় বনানী থানায়। খবর পেয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলামের নির্দেশনায় পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। পুলিশ সদস্যরা জনরোষ থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে হেফাজতে নেন এবং তার সঙ্গে থাকা কালো ট্রলি ব্যাগটি তল্লাশি করেন। তল্লাশি চালিয়ে ব্যাগটির ভেতর থেকে মোট সাতান্ন লাখ পাঁচ হাজার টাকার সমপরিমাণ জাল নোট উদ্ধার করা হয়, যা দেখে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অবাক হয়ে যান। গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তির নাম মো. রুবেল আহম্মেদ ফকির। তার বয়স ছিয়াচল্লিশ বছর এবং তার বাড়ি কোথায় বা তার পুরো চক্রটি কোথায় সক্রিয়, তা নিয়ে পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে এই রুবেল সাধারণ কোনো অপরাধী নন, বরং তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ইতিবাচক বা নেতিবাচক মিলিয়ে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।
এই ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইতিমধ্যে সমস্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যে সহযোগী এই ঘটনায় জড়িত থেকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং পলাতক আসামির ছবি ও পরিচয় শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এই জাল চক্রের মূল হোতা কারা এবং এই বিপুল পরিমাণ জাল নোট তারা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে, তা উদঘাটনের জন্য রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, একটি জুয়েলারি দোকানে এমন ধরণে বড় অংকের লেনদেনের সময় ব্যবসায়ীদের আরও বেশি সতর্ক ও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে অপরাধীরা বিভিন্ন আধুনিক এবং অভিনব পন্থায় সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে সর্বস্বান্ত করার পাঁয়তারা করছে। বনানীর এই ঘটনায় যদি দোকান কর্মচারীদের সামান্য বিচক্ষণতা না থাকত, তবে ওই ব্যবসায়ীর কুড়ি ভরি স্বর্ণালংকার সম্পূর্ণ খোয়া যেত এবং বিনিময়ে কেবল ভুয়া কাগজের স্তূপ হাতে পেতেন। এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান এবং জিরো টলারেন্স নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। আমরা আশা করি, পুলিশ খুব দ্রুত পলাতক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে এবং এই জালিয়াত চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত তা জাতির সামনে উন্মোচিত হবে। সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চিরতরে নির্মূল করতে সকলের সম্মিলিত সচেতনতা এবং সাহসিকতা অত্যন্ত জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত