প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কলাপাড়া উপকূলের হাজার হাজার জেলের জীবন যেন প্রতিদিন এক মরণপণ লড়াইয়ের অপর নাম। পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার চিরচেনা আকুতি নিয়ে তারা প্রতিদিন পাড়ি জমান উত্তাল বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে। অথচ তাদের এই জীবিকার তাগিদ পরিণত হয়েছে এক চরম জীবনসংকটে। আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট কিংবা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম ঘাটতি নিয়ে প্রতিদিন বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যেতে বাধ্য হচ্ছেন এই উপকূলীয় জেলেরা। সামান্য বৈরী আবহাওয়া কিংবা একটুখানি ঝড়ের পূর্বাভাস না পেলেই তাদের কপালে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। সরকারি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে উপকূলের বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ যেন এখনো অধরা রয়ে গেছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পটুয়াখালী জেলাজুড়ে সমুদ্র এবং নদনদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ জেলে। এর মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার হলেও বাস্তবে এর পরিধি অনেক বেশি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নেন। বেশিরভাগ মাছ ধরার ট্রলারে বাধ্যতামূলক যেসব জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম থাকার কথা, তার সিকিভাগও থাকে না। অনেক ট্রলার মালিক বৈধ কোনো লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র ছাড়াই গভীর সমুদ্রে ট্রলার পাঠাচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে, প্রকৃতির সামান্য রোষানলে পড়লেই সাগরে ঘটে মর্মান্তিক প্রাণহানি এবং বহু জেলের নিখোঁজ হওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বা বৈরী আবহাওয়ায় এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসেই সাগরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে অন্তত দশটি বড় আকারের মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ওই আকস্মিক দুর্যোগে পঞ্চাশের অধিক জেলে গভীর সমুদ্রে নিখোঁজ হন। কোস্টগার্ড ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় অনেককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বেশ কয়েকজন জেলের মরদেহ কিংবা কোনো খোঁজই আর পাওয়া যায়নি। গত সাত ও পনেরো জুলাই কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসা দুটি মৃতদেহ এই নির্মম বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ আর কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, অথচ পেটের দায়ে অন্য জেলেদের ঠিকই আবারও সেই উত্তাল জলেই বুক ভাসাতে হয়।
ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে অন্য একটি বাস্তব চিত্রও সামনে এসেছে। তাদের দাবি, প্রতিটি ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, ইমার্জেন্সি পজিশন ইন্ডিকেটিং রেডিও বিকন বা ইপিআইআরবি, উন্নত ফার্স্ট এইড বক্স এবং অন্যান্য আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন করতে হলে বেশ বড় অঙ্কের আর্থিক ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। হাজার থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি বা আর্থিক প্রণোদনা না থাকায় অনেক গরিব ও মাঝারি ট্রলার মালিক প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অপারগ হন। মুনাফার লোভে অথবা জীবনযাত্রার টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা বাধ্য হয়েই সামান্য সুরক্ষাবিহীন নৌকা ও ট্রলার নিয়ে সাগরে পাড়ি জমান, যা শত শত মানুষের জীবনকে সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রতিটি নৌযানের জন্য কিছু নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, ভিএইচএফ যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং সময়মতো সঠিক আবহাওয়া বার্তা পাওয়ার প্রযুক্তি প্রতিটি ট্রলারে থাকা আবশ্যক। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকার মনে করেন, সমুদ্রে জেলের প্রাণহানি কমাতে হলে আধুনিক নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে জেলেদের সচেতন করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যদি এই জেলেদের জীবন রক্ষায় বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়, তবে উপকূলীয় এই মানুষগুলোর অকাল মৃত্যু বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
মাঠপর্যায়ের জেলেদের সঙ্গে কথা বললে তাদের বুকফাটা কষ্টের চিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলে মতি হাওলাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান যে, পেটের টানে জীবন হাতে নিয়ে প্রতিদিন সাগরে যেতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি বা দুর্যোগের প্রচণ্ড ভয় থাকলেও তাদের বিকল্প কোনো আয়ের উৎস নেই। আরেক জেলে আব্দুল মান্নান শিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়লে যোগাযোগ করার মতো কোনো আধুনিক যন্ত্র বা ওয়াকিটকি থাকে না। অনেক সময় মাসের পর মাস নিখোঁজ থাকলেও দ্রুত কোনো উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। ট্রলার মালিক মিজানুর রহমানও সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন যেন নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ে সহজ শর্তে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়, যাতে তারা প্রতিটি ট্রলারকে শতভাগ নিরাপদ করে সাগরে পাঠাতে পারেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানিয়েছেন যে, পটুয়াখালী জেলায় প্রায় এক হাজার ট্রলারের সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ অনুমতিপত্র বা লাইসেন্স রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রায় দশ হাজারের বেশি ট্রলার অনিয়মিতভাবে সাগরে যাতায়াত করছে। অবৈধ ও অনিবন্ধিত ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কড়া নজরদারি এবং সচেতনতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান। তবে কেবল অভিযান চালিয়ে এই বিশাল অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন ও জেলের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন।

উপকূলের এই হতভাগ্য মানুষগুলোর জীবনের কি তবে কোনো দাম নেই? এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যারা প্রতিদিন দেশের আমিষের চাহিদা মেটাতে নিজেদের জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের অতল গভীরে লড়ে যান, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। পর্যাপ্ত জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ছাড়া সাগরে মাছ শিকার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি জেলেদের জন্য বিশেষ বীমা ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনেও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে এভাবেই ঝরে যাবে শত শত তাজা প্রাণ। উপকূলের এই নীরব কান্না এবার থামানো দরকার, আর তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও আন্তরিক সদিচ্ছা।