প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহলের আপত্তি ও উদ্বেগ উপেক্ষা করে দেশটির পক্ষ থেকে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন চরম কূটনৈতিক অস্থিরতা ও অস্বস্তি বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নতুন করে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে যে, ভারতের মাটিতে বসে দলটির শীর্ষস্থানীয় পলাতক নেতারা তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন এবং তারই অংশ হিসেবে আগামী ২৯ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্ট ক্লাবে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।
হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হতে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক সেমিনারের নির্ধারিত বিষয়বস্তু হিসেবে ‘ইউরো-এশিয়া সম্পর্ক: শান্তি, সমৃদ্ধ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অংশীদারত্ব’ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই নামকরণের আড়ালে মূলত বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়েই মূলত বিস্তারিত আলোচনা করার সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা দলটির কতিপয় শীর্ষস্থানীয় নেতার প্রত্যক্ষ মদদ ও নেপথ্য পরিকল্পনায় এই পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছে। যদিও এই সেমিনার আয়োজনের পেছনে সরাসরি ভারত সরকারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা নেই বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, তবুও এর নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশের পরোক্ষ সমর্থন ও প্রশ্রয় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

এদিকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে দিল্লির শীতল ও টানাপোড়েনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য যখন বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলে নতুন করে নানা উদ্যোগ ও দেনদরবার চলছে, ঠিক সেই সময়ে এ ধরনের একটি বিতর্কিত সেমিনার আয়োজন দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ২৯ আগস্ট নির্ধারিত তারিখে শেষ পর্যন্ত এই সেমিনারটি নির্ধারিত ভেন্যুতে আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে প্রভাবিত করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা হিসেবে এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতে চাইছে। দলটির পক্ষ থেকে তাদের ওপর আরোপিত রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা এবং শেখ হাসিনাসহ দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন রায়ের বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক মহলের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করার সুক্ষ্ম চক্রান্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্যে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী শান্তি, পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বড় করে বলা হলেও এর পর্দার আড়ালে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণই যে মূল আলোচনার বিষয় হবে, তা আয়োজকদের নামের তালিকা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে ড. হাছান মাহমুদ ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বিদেশি ও দেশীয় ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিশিষ্ট সদস্য ড. ওন্দ্রেজ দোস্তাল, খ্যাতিমান লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী, সাবেক কূটনীতিক পিটার ফাহরিন হোলজ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি, ডা. জাহানারা আরজু, এপিসি গ্লোবাল ফোরামের চেয়ারম্যান এস ভেঙ্কট নারায়ণ, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি ড. আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি এএফএম গোলাম জিলানীর মতো ব্যক্তিরা অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের এই মিশ্র ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি সেমিনারটিকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল একটি অধ্যায় পার করছে। ৫ আগস্টের পর থেকে সৃষ্ট নানামুখী কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রোপাগান্ডামূলক সেমিনারের আয়োজন দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার পরিবেশকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে যে, বিচারের মুখোমুখি হওয়া পলাতক অপরাধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা তাদের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় দেওয়ার যেকোনো অপচেষ্টা উভয় দেশের বন্ধুত্বের ভবিষ্যতের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক চ্যানেলে এই বিষয়ের ওপর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হয় এবং দিল্লি শেষ পর্যন্ত এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কী ধরনের নীতিনির্ধারণী অবস্থান গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি।