খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ, স্মরণে রাজনৈতিক জীবন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার
খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ, স্মরণে রাজনৈতিক জীবন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ এক নাম বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার ভূমিকা যেমন আলোচিত, তেমনি তার জীবন ছিল আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধী রাজনীতি, কারাবন্দিত্ব, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ অসুস্থতার নানা অধ্যায়ে পরিপূর্ণ। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

১৫ আগস্ট তার জন্মদিন হিসেবে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণের তথ্যটি দলীয় ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সে হিসাবে ২০২৫ সালে তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী এবং ২০২৬ সালে ৮১তম জন্মবার্ষিকী হওয়ার কথা। তাই চলতি বছরে তাকে ‘৮২তম জন্মদিন’ বলা সঠিক নয়। তার মৃত্যুর পর এবারের দিনটি জন্মদিন উদ্‌যাপনের চেয়ে স্মরণ ও শ্রদ্ধার আবহেই বেশি তাৎপর্য পাচ্ছে।

একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটির নেতৃত্বে উঠে আসা এবং তিন দফায় সরকার পরিচালনা করা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি সামনে আসেন, সেটি ছিল অস্থির ও পরিবর্তনশীল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সংকট তৈরি হয়। পরের বছর সামরিক শাসনের সূচনার পর দলটির নেতাকর্মীদের আহ্বানে খালেদা জিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। সেই আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সময় তাকে আটক করা হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এরশাদের পতনের পর তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

এই সময় থেকেই খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। রাজপথের আন্দোলনে তার নেতৃত্ব বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে তাকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। সামরিক শাসনের অবসানের পর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেখানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৯ মার্চ খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার প্রথম সরকার সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা ও বৃত্তি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতির বিভিন্ন উদ্যোগ তার সরকারের সময়ে নেওয়া হয়।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে খালেদা জিয়ার সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ২৫ মার্চ সংসদে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হয় এবং ৩০ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। অল্প সময়ের এই সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনের পর একই বছর জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি আবার বিরোধী দলে যায়। পাঁচ বছর পর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পায়। ১০ অক্টোবর দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। এই মেয়াদে শিক্ষা, যোগাযোগ, নারীশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

২০০৬ সালে তার সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে জরুরি অবস্থা ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নতুন এক কঠিন পর্যায়ে প্রবেশ করে।

২০১০ সালে রাজধানীর সেনানিবাসের বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আদালত তাকে কারাদণ্ড দেন। এরপর তাকে পুরান ঢাকার পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। একই বছর জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলাতেও তার সাজা হয়। বিএনপি বরাবরই এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে।

কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। বয়সজনিত বিভিন্ন জটিলতার সঙ্গে কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন তিনি। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি গুলশানের বাসভবনে অবস্থান করেন এবং চিকিৎসা নেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ বন্দিত্ব ও আইনি জটিলতার একটি বড় অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এরপর তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়।

জীবনের শেষ পর্যায়েও শারীরিক অসুস্থতা তার সঙ্গে ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার মৃত্যু ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। জানাজা ও দাফনে বিপুল মানুষের উপস্থিতি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবেরই একটি প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে একমাত্র কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি যেমন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছেন, তেমনি দীর্ঘ সময় দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে নির্বাচনী রাজনীতি, সরকার পরিচালনা এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক। অন্যদিকে তার শাসনামল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক নেতাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই তার অর্জন, সিদ্ধান্ত, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুকেই ইতিহাসের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হয়।

এবার ১৫ আগস্ট তার জন্মদিনে তিনি নিজে নেই। ফলে দিনটি তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সমর্থক ও অনুসারীদের কাছে একদিকে স্মৃতির, অন্যদিকে শোকের। জীবদ্দশায় যে দিনটি দলীয় কর্মসূচি ও নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছায় ঘিরে থাকত, মৃত্যুর পর সেই দিনটি পরিণত হয়েছে একজন প্রয়াত রাজনৈতিক নেত্রীর জীবন ও অবদানের পুনর্মূল্যায়নের উপলক্ষে।

খালেদা জিয়ার জীবন তাই শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক অতিক্রম করা এক নারীর দীর্ঘ যাত্রা। গৃহবধূ থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসা, রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া, বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় কাটানো, কারাবন্দিত্ব ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত