তারেকের দিল্লি সফরে হাসিনা ইস্যুতে টানাপোড়েন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার
তারেকের দিল্লি সফরে হাসিনা ইস্যুতে টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের সফর আয়োজনের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সফরটি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও এই বিষয়টি এখনো ঢাকার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে আছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি নতুন ও কার্যকর পর্যায়ে নিতে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতাও ঢাকার অসন্তোষের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি দিল্লি সফর শেষে ঢাকায় ফিরেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সফরের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। দিল্লিতে গিয়ে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। এরপর ঢাকায় ফিরে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর সফরসহ দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।

সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভারতের হাইকমিশনার শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের পাশাপাশি দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। সফরের তারিখ, কর্মসূচি ও বৈঠকের কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ আগেই জানানো হয়েছে। পরে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং ব্রিকসের আসরেও আমন্ত্রণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে সফর নিয়ে কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এর মধ্যেই শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ঘটনায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে। ঢাকার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। ঘটনাটিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি অবমাননা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

এর কয়েক দিন পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে, ভারত সরকার তা অনুমোদন করে না। দিল্লির এই বক্তব্য পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।

ঢাকার কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিষয়টি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ চাইছে, ভারতের মাটিতে থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল না করে এবং প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অন্তত দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে। অন্যদিকে ভারতও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। ফলে সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার একটি পথ খোঁজা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক বিষয়ই নয়, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা ও অভিন্ন নদীর বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ সফরে এটি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। ভারতের শীর্ষস্থানীয় বণিক সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী সোমবার তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের এটি প্রথম বাংলাদেশ সফর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রতিনিধিদলটি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে বৈঠক করবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে এসব আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি বাদ দিয়ে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা কঠিন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ঢাকার রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সীমান্তে প্রাণহানি, অবৈধ পারাপার, চোরাচালান এবং সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সম্ভাব্য আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর হলে এটি হবে দুই দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা। এক বৈঠকে সব অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি আলোচনায় বসলে পারস্পরিক অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্বস্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো এগিয়ে নেওয়ার নতুন পথ তৈরি হতে পারে।

ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সাম্প্রতিক যোগাযোগ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—উভয় দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি স্থবির হয়ে যাক, তা চায় না। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে রাজনৈতিক আস্থার সংকট বড় বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি; আর ভারতের জন্য নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করেই আগামী দিনের সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

এ কারণে সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তাদের মতে, এই সফর হলে সেখানে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষ কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর। আগামী কয়েক দিনের ঢাকা-দিল্লি যোগাযোগ তাই সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনাও অনেকটা স্পষ্ট করে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত