প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানায় কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায় কর্মরত দেড় লাখের বেশি শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ওপর। উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেকেই কর্মস্থলে গিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের দাবি, গ্যাসের স্বল্প সরবরাহে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনোরকমে উৎপাদন চালানোর পর বুধবার থেকে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার চাকা থেমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এতে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেড বলছে, এটি শুধু হবিগঞ্জের সমস্যা নয়, জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকটের অংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
মাধবপুর উপজেলার যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। সেখানে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ার প্লান্টসহ ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ার প্লান্ট ছাড়া অন্য কারখানাগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী।
পার্কটির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবুল হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। গ্যাসের অভাবে সবগুলো কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে কোম্পানিটির দৈনিক প্রায় শত কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
তিনি জানান, এসব কারখানায় প্রতিদিন গ্যাসের অনুমোদিত চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে সরবরাহ করা হচ্ছিল মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। এত কম গ্যাসে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো প্রায় অসম্ভব। এরপর বুধবার রাত ১২টা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
গ্যাসনির্ভর শিল্পের জন্য সংকটটি শুধু উৎপাদন বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক কারখানা নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে গ্যাস না থাকলে উৎপাদন যন্ত্রপাতির পাশাপাশি কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়ে। এতে শ্রমিকেরা কর্মস্থলে থাকলেও উৎপাদনের সুযোগ থাকে না।
একই উপজেলার বাদশা পাইওনিয়ারেও একই পরিস্থিতি। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক খায়রুল আলম জানান, সেখানে স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। গ্যাস সরবরাহ কমতে কমতে একপর্যায়ে বুধবার দুপুর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তাঁর হিসাবে, এতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়ে। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট করতে না পারলে অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন অর্ডার নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এসএম স্পিনিং কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, সেখানে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। গত বুধবার বিকেল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন সম্পূর্ণ থেমে গেছে।
কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলে জানান তিনি। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনের পুরোটাই রপ্তানিনির্ভর হওয়ায় সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে ক্রেতাদের আস্থা হারানোর আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
সায়হাম গ্রুপেও একই চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী রেজাউল হক জানান, ২২ জুলাই থেকে গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত ছিল। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, আবার কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।
সায়হাম গ্রুপে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। গ্যাসের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি কারখানার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে।
শায়েস্তাগঞ্জের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কেও গ্যাস সংকটের কারণে একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা চললেও বুধবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন অবস্থায় সময় কাটাচ্ছেন।
একই উপজেলার স্কয়ার ডেনিমেও উৎপাদন বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, কারখানাটিতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। দৈনিক গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বুধবার বিকেল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন থেমে গেছে। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা তাঁর।
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানার মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানিনির্ভর। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এর ফলে একদিকে যেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে দেশের রপ্তানি আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব না হলে অর্ডার বাতিল, জরিমানা এবং ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু মালিকপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; এর সঙ্গে শ্রমিকদের আয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে থাকে।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে সংকট শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ানোর কারণেই মূলত শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর আশা, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে।
তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে কয়েক দিনের এই অপেক্ষাও বড় ক্ষতির কারণ। কারখানা বন্ধ থাকা প্রতিটি দিন মানে উৎপাদন হারানো, অর্ডার পূরণে বিলম্ব এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন করে, তাদের জন্য অনিশ্চয়তা আরও বেশি।
হবিগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু গ্যাস সরবরাহের একটি সাময়িক সংকট নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপর সম্ভাব্য বড় চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। এখন তাঁদের অপেক্ষা, কবে স্বাভাবিক হবে গ্যাসের চাপ এবং কবে আবার চালু হবে দীর্ঘদিনের কর্মচঞ্চল শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনের চাকা।