দুই ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে নবম পে-স্কেল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার
দুই ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে নবম পে-স্কেল

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেলের খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হতে পারে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বর্তমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের ব্যবধান নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নবম পে-স্কেলের খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় যাওয়ার খবর নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

খসড়া প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কত ধাপে এবং কীভাবে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভাই নেবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে সব গ্রেডের জন্য একই হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়নি। বরং উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি।

এ ধরনের প্রস্তাবের পেছনে মূলত বেতন কাঠামোয় তুলনামূলক ভারসাম্য আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকারি চাকরির বিভিন্ন স্তরে কর্মরত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এক হলেও আয় ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়।

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবে নিম্ন গ্রেডের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর বিষয়টি তাই সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির হার, নতুন গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন এবং ভাতার পরিমাণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির গত বুধবারের বৈঠকে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে পে-স্কেল নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও পর্যালোচনা হয়েছে। চূড়ান্ত খসড়া এখন সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পরও প্রস্তাবে পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধারা, বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের সময়সূচি কিংবা ভাতাসংক্রান্ত বিষয়ে সংশোধন আনা হতে পারে। ফলে সচিব কমিটির সুপারিশকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে নবম পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কার্যকর করে ২০২৮ সালের জানুয়ারি নাগাদ পুরো কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে এই সময়সূচিও এখনো চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর বাস্তবায়নের ধাপ ও সময় নির্ভর করবে।

দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাবের একটি বড় কারণ হতে পারে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেট ব্যবস্থাপনা। একসঙ্গে বড় অঙ্কের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা সামলানোর সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ধীরে ধীরে নতুন সুবিধার আওতায় আসবেন।

তবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়লে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।

এদিকে নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু জটিলতাও সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে সমাধানের পথ বের করতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার।

বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় পে-স্কেলের কাঠামো ও বাস্তবায়নের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে ওই কমিটি কাজ করবে বলে জানা গেছে। বিশেষ কমিটির সুপারিশও শেষ পর্যন্ত পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে নতুন পে-স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একটি পরিবারের মাসিক আয় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়ার কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ফিরবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে তাদের মধ্যে।

অন্যদিকে সরকারের জন্য বিষয়টি অর্থনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একদিকে কর্মীদের ন্যায্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা—দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মন্ত্রিসভায় খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপনের পরই নবম পে-স্কেলের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। সেখানে বেতন বৃদ্ধির হার, গ্রেডভিত্তিক নতুন মূল বেতন, ভাতা, বাস্তবায়নের ধাপ ও সময়সূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সচিব কমিটির সুপারিশে পরিবর্তনও আনা হতে পারে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম পে-স্কেলের খসড়া মন্ত্রিসভায় যাওয়ার প্রস্তুতি সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন তাদের নজর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের দিকে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয়ই নয়, তাদের পরিবারের জীবনযাত্রা, ব্যয় পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির হার বা বাস্তবায়নের সময়সূচিকে নিশ্চিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো ও কার্যকর হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত