প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলেকে রড দিয়ে পিটিয়ে সোনা, রুপা ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় তাঁদের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসা এক প্রতিবেশীকেও মারধর করা হয়। পরে আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে সদর উপজেলার পূর্ব শানবান্দা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী পতিত পবন শীল, তাঁর ছেলে প্রবীর কুমার শীল এবং প্রতিবেশী মনোরঞ্জন পাল আহত হয়েছেন। আহত তিনজনকে পরে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে পবন শীলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো শুক্রবার রাতেও দোকানের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন ৭২ বছর বয়সী পবন শীল ও তাঁর ছেলে প্রবীর কুমার শীল। তাঁরা স্বর্ণালঙ্কার তৈরির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দোকান বন্ধ করার পর সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রী একটি ব্যাগে নিয়ে তাঁরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পূর্ব শানবান্দা এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ তিন থেকে চারজন ব্যক্তি তাঁদের পথরোধ করে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় বাবা ও ছেলেকে। আকস্মিক হামলায় তাঁরা মাটিতে পড়ে যান। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা।
প্রবীর কুমার শীল জানান, ওই ব্যাগে প্রায় ৬০ ভরি রুপা, দুই আনা সোনা এবং নগদ ৮৫ হাজার টাকা ছিল। দোকান বন্ধ করে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় তিনি ব্যাগটি বহন করছিলেন। হামলার পর দুর্বৃত্তরা সেটিই নিয়ে যায়।
হামলার সময় পবন শীলের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তাঁর ছেলে প্রবীরও আহত হন। তাঁদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী মনোরঞ্জন পাল তাঁদের সহায়তায় এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা তাঁকেও রড দিয়ে আঘাত করে।
এরপর হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে জানা গেছে। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ঘটনার খবর পেয়ে রাত ১১টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে আহত তিনজনকে উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় পুলিশ মাটিতে পড়ে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের একটি কার্তুজ উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন।
ওসি মনির হোসেন বলেন, খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। সেখানে পড়ে থাকা একটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাইয়ের শিকার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মামলা হলে ঘটনার বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
ঘটনার পর পূর্ব শানবান্দা এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ব্যবসায়ীদের চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একটি ব্যস্ত এলাকায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় এ ধরনের হামলা হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্বর্ণ ও রুপার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন দোকান বন্ধের পর মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমন সময় যদি পথরোধ করে হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, তাহলে ব্যবসায়ী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যবসায়ী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য এ ধরনের ঘটনা বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, ছিনতাইয়ের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ। এতে শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীর সংখ্যা, তাদের পরিচয় এবং লুট হওয়া সোনা, রুপা ও নগদ অর্থের পরিমাণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, আশপাশের মানুষের তথ্য এবং সম্ভাব্য অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হবে।
একটি পরিবারের কাছে একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে থাকা সোনা, রুপা ও নগদ অর্থ শুধু ব্যবসায়িক সম্পদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন শ্রম, পুঁজি ও জীবিকার নিশ্চয়তা। সেই সম্পদ হারানোর পাশাপাশি একজন প্রবীণ ব্যবসায়ীকে হামলায় আহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারটির ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপও তৈরি হয়েছে। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
মানিকগঞ্জের এই ঘটনা তাই শুধু একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল্যবান সামগ্রী বহনকারী ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা, রাতের সড়কে নজরদারি এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই নতুন করে সামনে এনেছে এই হামলা। তদন্তের অগ্রগতি এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হবে, কীভাবে পরিকল্পিত এই হামলা সংঘটিত হয়েছিল এবং এর পেছনে কারা ছিল।