প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলেই জুলাই, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।
রোববার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণ অনুষ্ঠান ২০২৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা এবং নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, আন্দোলনের সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। সেখানে থাকা হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশের বাইরে কী ঘটছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে পারতেন না। পরিস্থিতি সম্পর্কে সীমিত তথ্যের মধ্যেই দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। তবে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর কারাগারে দ্রুত পৌঁছে যায় এবং ওই সংবাদ বন্দিদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারাগারের জেল সুপার তাঁর কাছে সহযোগিতা চান। তখন তিনি বন্দিদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের পর মানুষের প্রত্যাশা যে কতটা বেড়ে গেছে, সেই বাস্তবতাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরুর বক্তব্যে উঠে আসে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অধিকারবঞ্চনার প্রসঙ্গ। তাঁর ভাষায়, দেশের মানুষ ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক সমতার অভাব দীর্ঘ সময় ধরে অনুভব করেছে। রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাভাবিকভাবে অর্থনীতির মূলধারায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারায়। ফলে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নতুন বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, ৩১ দফা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের একটি রূপরেখা হিসেবে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন এবং যারা নানা ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা কেবল স্মরণসভা বা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই এসব সংগ্রামের অর্জনকে অর্থবহ করতে হবে।
বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচির দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’—এই ধারণাগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের প্রতিটি নাগরিককে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। উন্নয়নের সুফল যাতে কেবল একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আমির খসরুর মতে, শুধু রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করলেই একটি গণতান্ত্রিক সমাজ পূর্ণতা পায় না। মানুষের কর্মসংস্থান, আয়, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির কাঠামোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বৈষম্য কমবে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
এ প্রসঙ্গে সৃজনশীল অর্থনীতির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশের গ্রামীণ শিল্পী, কারুশিল্পী, খেলোয়াড়, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন সৃজনশীল পেশার মানুষকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। এসব মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ ঋণ, নকশা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, স্পোর্টস ইকোনমি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। শীতলপাটি, মৃৎশিল্পসহ বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত পণ্যগুলোকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় ঐতিহ্যকে শুধু সংস্কৃতির অংশ হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করার ওপর জোর দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন ছিল বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট ছিল। সেই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি, বরং মাইনাস থেকে শুরু করেছি।’ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জনগণের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিকে সরকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন আমির খসরু। তাঁর মতে, নিম্নআয়ের পরিবার, কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছাতে পারলে তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একই সঙ্গে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও উৎপাদন সক্ষমতার উন্নয়ন ঘটানোর সুযোগ রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের আরও কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যে মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে। আমির খসরু বলেন, জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি কার্যকর জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, শিশু, শ্রমিক, প্রতিবন্ধী এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীসহ সব শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্য যে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে—এমন একটি বার্তাই তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, আন্দোলনের সময় যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণ অনুষ্ঠানটি তাই শুধু অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মরণে সীমাবদ্ধ ছিল না। আলোচনায় উঠে আসে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কেমন হবে, জনগণের প্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করা যাবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব—এসব প্রশ্নও।
বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একরামুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক এবং ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ।
জুলাইয়ের আন্দোলনকে ঘিরে দুই বছর পরও দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নানা আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনের সময়কার আত্মত্যাগ, নিহত ও আহতদের স্মৃতি এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা এখনো জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থনীতির সুফল সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যাশাও যুক্ত। আমির খসরুর বক্তব্যে সেই বৃহত্তর বাস্তবতাই সামনে এসেছে। তাঁর মতে, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে স্মরণ করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়বে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
শেষ পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি কতটা অর্থবহ হয়ে উঠবে, তা নির্ধারিত হবে শুধু স্মরণ ও আলোচনায় নয়, বরং রাষ্ট্রের কার্যক্রমে মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটা ঘটছে তার ওপর। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বার্তাও সেখানেই—আন্দোলনের ইতিহাসকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেই ইতিহাসের সার্থকতা অর্জন করতে হবে।