সত্য ঘটনা থেকে ওটিটির গল্প, কতটা দায়বদ্ধ নির্মাণ?

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত কনটেন্টের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যাংক জালিয়াতি, হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক ট্র্যাজেডি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, শিশু নির্যাতন কিংবা সামাজিক বঞ্চনার মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা এখন ওয়েব সিরিজ ও ওয়েব ফিল্মের গল্পের উপাদান হয়ে উঠছে। তবে নির্মাতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো হুবহু তুলে ধরছেন না। বাস্তবতার ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কল্পিত চরিত্র, সংলাপ ও পরিস্থিতি।

এই প্রবণতা একদিকে দর্শকের কাছে গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আগ্রহ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তব ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি নির্মাতাদের দায়বদ্ধতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।

ব্যাংক কেলেঙ্কারি থেকে ‘মানি হানি’

বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে বাংলাদেশের ওটিটির অন্যতম আলোচিত কাজ ‘মানি হানি’। হইচইয়ের এই ওয়েব সিরিজ পরিচালনা করেছেন তানিম নূর ও কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়।

কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা থেকেই সিরিজটির মূল ভাবনা নেওয়া হয়। তানিম নূর সংবাদপত্রে ঘটনাটি পড়ার পর সেটিকে গল্পে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পান। তবে নির্মাতারা স্পষ্ট করেছেন, বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি থাকলেও সিরিজের বড় অংশই কল্পিত।

এখানেই বাস্তব ঘটনাকে গল্পে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। দর্শক গল্পের পেছনে বাস্তবতার অস্তিত্ব অনুভব করেন, আবার নির্মাতাও থ্রিলার নির্মাণের প্রয়োজন অনুযায়ী আখ্যানকে বিস্তৃত করার স্বাধীনতা পান।

‘একাত্তর’-এ ইতিহাসের অন্য পাঠ

তানিম নূরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ ‘একাত্তর’। হইচইয়ের এই সিরিজ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ‘অপারেশন ব্লিটজ’-কে কেন্দ্র করে নির্মিত। এর অন্যতম উৎস হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসেন রাজার লেখা ‘A Stranger in My Own Country’ বইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এটি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সরাসরি পুনর্নির্মাণ নয়। নির্মাতা এটিকে ফিকশন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে কয়েকজন সাধারণ মানুষের গল্পের মধ্য দিয়ে একটি অস্থির সময়কে দেখানো হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে ইতিহাস কেবল তারিখ, ঘটনা কিংবা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, ভয়, অনিশ্চয়তা ও আবেগের মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছায়।

‘আগস্ট ১৪’ ও বাস্তব হত্যাকাণ্ডের ছায়া

বাস্তব ঘটনা নিয়ে নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত কনটেন্টগুলোর একটি ‘আগস্ট ১৪’। শিহাব শাহীন পরিচালিত বিঞ্জের এই সিরিজটি ২০১৩ সালে ঢাকার চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত।

ঘটনাটির সঙ্গে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও যুক্ত ছিল। বাস্তব হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিরিজটি দর্শকের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে—বাস্তব মানুষের মৃত্যু ও পারিবারিক বিপর্যয়কে বিনোদনের উপাদানে পরিণত করার সীমা কোথায়?

এই প্রশ্ন বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত প্রতিটি কনটেন্টের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

‘চক্র’: বাস্তব ট্র্যাজেডি থেকে কল্পনার বিস্তার

২০২৪ সালে আইস্ক্রিনে মুক্তি পাওয়া ‘চক্র’ পরিচালনা করেন ভিকি জাহেদ। ২০০৭ সালে ময়মনসিংহের কাশর এলাকায় একই পরিবারের নয় সদস্যের ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা থেকেই সিরিজটির মূল ভাবনা আসে।

ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে ‘চক্র ২’-এর প্রসঙ্গে নির্মাতা জানিয়েছেন, বাস্তব ‘অ্যাডাম ফ্যামিলি’র ঘটনা তাকে ভাবিয়েছে। বাস্তব গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে কল্পনাকে মিলিয়েই তৈরি হয়েছে সিরিজের জগৎ।

অর্থাৎ এখানে বাস্তব ঘটনা ছিল গল্পের সূচনা, শেষ নয়। পর্দার আখ্যান বাস্তব ঘটনার সীমা ছাড়িয়ে একটি স্বতন্ত্র ফিকশনাল জগৎ তৈরি করেছে।

নিজের মেয়ের অভিজ্ঞতা থেকে ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’

বাস্তব অভিজ্ঞতার সবচেয়ে ব্যক্তিগত উদাহরণগুলোর একটি শিহাব শাহীন পরিচালিত ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’।

২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পরিচালকের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা এই নির্মাণের ভিত্তি। গভীর রাতে মেয়ে ফোন করে জানায়, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। নিরাপদে থাকার জন্য বাবাকে ফোনে কথা বলে যেতে বলে সে।

ঘটনাটি পরিচালক হুবহু পর্দায় আনেননি। বরং একজন অসহায় বাবা এমন পরিস্থিতিতে কী করতে পারেন, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তিনি গল্পকে কল্পনার মাধ্যমে বিস্তৃত করেছেন।

এখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর থ্রিলার আখ্যানের ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

‘তনয়া’য় বাস্তবতার অস্বস্তিকর মুখ

ইমরাউল রাফাত পরিচালিত চরকি ফ্লিক ‘তনয়া’ ২০১২ সালের একটি সত্য ঘটনা থেকে নির্মিত। পরিচালকের পরিচিত একজনের কাছ থেকে ঘটনাটি শোনার পর তিনি সেটিকে পর্দায় আনার সিদ্ধান্ত নেন।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে স্কুলপড়ুয়া এক কিশোরী, যার জীবন একটি ভয়াবহ ঘটনার পর সম্পূর্ণ বদলে যায়। এরপর তাকে পরিবার, সমাজ ও সামাজিক বিচারের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

এ ধরনের গল্পের শক্তি হলো, দর্শককে কেবল ঘটনার দর্শক না রেখে ভুক্তভোগীর অবস্থান থেকে সমাজকে দেখার সুযোগ তৈরি করা।

‘প্রিয় মালতী’তে ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে সামাজিক প্রশ্ন

শঙ্খ দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘প্রিয় মালতী’ও সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। শাঁখারী বাজারের একটি পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নির্মিত গল্পে স্বামীর মৃত্যুর পর একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পটি একটি ব্যক্তিগত সংকটকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে মালতীর সংগ্রাম কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত গল্প হয়ে থাকেনি; বরং সমাজের নানা কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

কেন বাস্তব ঘটনা এত আকর্ষণীয়?

নির্মাতাদের কাছে বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের বড় তিনটি সুবিধা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, আবেগ এবং সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা।

দর্শক যখন জানতে পারেন কোনো গল্পের শিকড় বাস্তবতায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাস্তব ঘটনা সমাজের এমন কিছু সমস্যা সামনে আনার সুযোগ দেয়, যেগুলো কাল্পনিক গল্পে হয়তো একই মাত্রায় গ্রহণযোগ্যতা পেত না।

পরিচালক সৈয়দ আহমেদ শাওকীর ‘তাকদীর’ নির্মাণের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের গল্পে বাংলাদেশকে দৃশ্যমান করার গুরুত্ব উঠে এসেছিল। স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে গল্পের কেন্দ্রে রাখার মাধ্যমে দেশীয় কনটেন্ট আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে পারে।

কিন্তু ঝুঁকিও রয়েছে

বাস্তব ঘটনা পর্দায় আনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তব মানুষ ও ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতা।

হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, আত্মহত্যা কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা যখন বিনোদনের ভাষায় উপস্থাপিত হয়, তখন নাটকীয়তা বাড়ানোর প্রয়োজনে বাস্তবতার বিকৃতি ঘটার ঝুঁকি থাকে। কোনো ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা দর্শকের বিনোদনের উপকরণে পরিণত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আরেকটি সমস্যা হলো ফিকশন ও বাস্তবতার সীমারেখা। নির্মাতা যখন বাস্তব গবেষণার সঙ্গে কল্পনা যুক্ত করেন, তখন দর্শকের কাছে কোন অংশ সত্য এবং কোন অংশ নির্মাতার সৃজনশীল সংযোজন—তা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

‘চক্র’-এর মতো নির্মাণে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও পুরো আখ্যানটি যে বাস্তব ঘটনার পুনর্নির্মাণ নয়, সেটি দর্শকের বোঝা জরুরি।

সামনে কোন পথে বাংলাদেশের ওটিটি?

বাংলাদেশের ওটিটিতে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মাণের প্রবণতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—দর্শক শুধু কাল্পনিক বিনোদন নয়, নিজেদের সমাজ ও চারপাশের বাস্তবতাকেও গল্পের মাধ্যমে দেখতে আগ্রহী।

‘মানি হানি’র আর্থিক অপরাধ, ‘আগস্ট ১৪’-এর পারিবারিক হত্যাকাণ্ড, ‘চক্র’-এর ট্র্যাজেডি, ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’-এর ব্যক্তিগত আতঙ্ক এবং ‘তনয়া’র সামাজিক বাস্তবতা—প্রতিটি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতাকে পর্দায় নিয়ে এসেছে।

তবে বাস্তব ঘটনা একটি গল্পকে শক্তিশালী করলেই সেটি সফল নির্মাণ হয়ে যায় না। নির্মাতাকে একই সঙ্গে গল্প বলার স্বাধীনতা এবং বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।

বাংলাদেশের ওটিটির পরবর্তী চ্যালেঞ্জ তাই শুধু নতুন নতুন ‘সত্য ঘটনা’ খুঁজে বের করা নয়। বরং সেই সত্যকে কতটা সংবেদনশীল, সৎ এবং শিল্পসম্মতভাবে পর্দায় তুলে ধরা যায়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত