প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাম্বিয়ায় দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন হাকাইন্ডে হিচিলেমা। মঙ্গলবার দেশটির নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করে। ঘোষিত ফলে ৬৪ বছর বয়সী হিচিলেমা প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী ব্রায়ান মুন্দুবিলে পেয়েছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট। ভোটের ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে আফ্রিকার তামা-সমৃদ্ধ দেশটির নেতৃত্বে আরও পাঁচ বছরের জন্য হিচিলেমার অবস্থান নিশ্চিত হলো।
গত বৃহস্পতিবার জাম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও ভোটের আগে থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, গ্রেপ্তার, সহিংসতা এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল। ভোট গণনার সময়ও বিরোধীদের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে। ফলে হিচিলেমার জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, বরং দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।
হিচিলেমা ২০২১ সাল থেকে জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ১৩ জন। তবে শেষ পর্যন্ত মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে হিচিলেমা ও ব্রায়ান মুন্দুবিলের মধ্যে। মুন্দুবিলে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিরোধী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে ভোটারদের সামনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
নির্বাচন কমিশনের চেয়ারপারসন মওয়াঙ্গালা জালৌমিস ফল ঘোষণার সময় জানান, মুন্দুবিলে প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ২২৬টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে তখনও পাঁচটির ফলাফল ঘোষণা করা বাকি ছিল। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাকি আসনগুলোর ফল সামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। ফলে হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত হওয়ায় আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই মূল ফলাফল কার্যত স্পষ্ট হয়ে যায়।
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর হিচিলেমা সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তাঁদের আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, জনগণ তাঁর ওপর যে বিশ্বাস রেখেছে, তার জন্য তিনি সত্যিই কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে যারা অন্য প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদেরও প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার অঙ্গীকার করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।
ফল ঘোষণার পর রাজধানী লুসাকার রাস্তায় নেমে আসে হিচিলেমার দল ইউনাইটেড পার্টি ফর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের শত শত সমর্থক। লাল পোশাক পরা সমর্থকেরা গান গেয়ে ও নেচে বিজয় উদ্যাপন করেন। কোথাও কোথাও আতশবাজিও ফোটানো হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর নিজেদের নেতার পুনর্নির্বাচনকে তাঁরা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
তবে বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ফল ঘোষণার আগেই ব্রায়ান মুন্দুবিলে ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ করেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, ভোটের ফলাফল সংক্রান্ত কিছু নথিতে কারসাজি করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি প্রদেশে কর্মকর্তাদের ভোটের সংখ্যা পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
মুন্দুবিলের অভিযোগের সঙ্গে নির্বাচনের আগে ও ভোট গণনার সময়কার রাজনৈতিক উত্তেজনাও যুক্ত হয়েছে। জাম্বিয়া সরকার দাবি করেছে, মুন্দুবিলের দল এনআরপিইউপির কয়েকজন সদস্য সশস্ত্র গোষ্ঠী বা বিদ্রোহী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন বিরোধী দলের নেতা-কর্মী। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উন্নতমানের অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সশস্ত্র বিদ্রোহে ব্যবহারের অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে মুন্দুবিলের দল সরকারের এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। বিরোধী দলের দাবি, তাদের কোনো নেতা বা কর্মী সশস্ত্র বিদ্রোহ কিংবা কোনো ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। দলটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, মুন্দুবিলের বাড়িতে পুলিশি অভিযান চালানোর সময় গুলি ছোড়া হয় এবং এতে একজন সংসদ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল।
ভোট গণনার সময়ও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। ভোটকেন্দ্রের কর্মীদের ওপর হামলা এবং ব্যালট পেপার চুরির অভিযোগ ওঠার পর গত শুক্রবার প্রায় ছয় ঘণ্টা ভোট গণনা স্থগিত রাখা হয়। নির্বাচন কমিশন পরে জানায়, নিরাপত্তা হুমকি নিয়ন্ত্রণে আসার পর গণনা আবার শুরু করা হয়েছে। তবে এই বিরতির কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষক দল মনে করে, ভোট গণনা স্থগিত রাখার মতো ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভোটারদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করেছে এবং হিচিলেমাকে বিজয়ী হিসেবে নিশ্চিত করেছে।
হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে অর্থনীতি। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকার ঋণ পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছে। জাম্বিয়ার দীর্ঘদিনের ঋণসংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও গুরুত্ব পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমে আসা এবং অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরাকে হিচিলেমা তাঁর সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাম্বিয়ার বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির দুই কোটির বেশি মানুষের বড় একটি অংশ অত্যন্ত কম আয়ে জীবনযাপন করে। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে হিচিলেমার জন্য শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই যথেষ্ট হবে না; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে তামা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশটি আফ্রিকার অন্যতম প্রধান তামা উৎপাদক এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে খনিজ সম্পদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বাজারে তামার চাহিদা বাড়লে জাম্বিয়ার অর্থনীতি উপকৃত হয়, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমে গেলে দেশটির রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে চাপ পড়ে। ফলে হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদে খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিকভাবেও নতুন মেয়াদে হিচিলেমার সামনে কঠিন পরীক্ষা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোট গণনা নিয়ে বিতর্ক এবং গ্রেপ্তারকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলো তাঁর সরকারের ওপর নজরদারি বাড়াবে। দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার যদি বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ বাড়াতে পারে এবং নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে দেশটির গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
জাম্বিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯১ সালে বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে। আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় এই ধারাবাহিকতা জাম্বিয়ার গণতান্ত্রিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদে সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখা হবে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।
হিচিলেমার পুনর্নির্বাচন তাই একদিকে তাঁর প্রথম মেয়াদের নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে সামনে তুলে ধরছে আরও বড় প্রত্যাশা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো, তামা-নির্ভর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করা, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সাফল্য নির্ধারিত হতে পারে। রাজধানী লুসাকার রাস্তায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে যে নতুন অধ্যায় শুরু হলো, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামী পাঁচ বছরে জাম্বিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আসে, তার ওপর।