দেশভাগের ক্ষত কেন বারবার টানে বলিউডকে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
দেশভাগের ক্ষত কেন বারবার টানে বলিউডকে

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৪৭। একটি বছর, একটি সীমারেখা, আর তার সঙ্গে বদলে যাওয়া কোটি মানুষের জীবন। ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তানের জন্মের পর কেটে গেছে প্রায় আট দশক। কিন্তু সময় যতই পেরিয়েছে, সেই বিভাজনের গল্প যেন ততবার নতুন করে ফিরে এসেছে সিনেমার পর্দায়। কখনো তা হয়েছে হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, কখনো ঘরছাড়া মানুষের বেদনা, কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নির্মম দলিল, আবার কখনো দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী আবেগের বড় আয়োজন।

হিন্দি সিনেমায় দেশভাগের এই ফিরে আসা নতুন কোনো প্রবণতা নয়। ‘গরম হাওয়া’, ‘তমস’, ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, ‘১৯৪৭: আর্থ’, ‘পিঞ্জর’ থেকে ‘গদর: এক প্রেম কথা’—প্রতিটি সিনেমাই একই ইতিহাসকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। এবার সেই ধারায় যুক্ত হয়েছে ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’। রাজকুমার সন্তোষীর পরিচালনায় এবং আমির খানের প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন সানি দেওল, প্রীতি জিনতা, শাবানা আজমি, করণ দেওল, আলী ফজল ও অভিমন্যু সিং। ভারতের স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন, ১৪ আগস্ট ছবিটির মুক্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ছবিটির পটভূমি দেশভাগের সময়ের লাহোর। দেশভাগের পর একটি মুসলিম পরিবার নতুন জীবনের আশায় একটি পুরোনো হাভেলিতে এসে ওঠে। কিন্তু বাড়িটিতে তখনো বসবাস করছেন এক বৃদ্ধ হিন্দু নারী, যিনি সেটিকে নিজের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেন। একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের এই টানাপোড়েন ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে দেশভাগের প্রতীক হিসেবে। একই ছাদের নিচে থাকা মানুষগুলোর পরিচয়, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্পর্কের অর্থ বদলে যায়।

ছবিটির আরেকটি আকর্ষণ প্রীতি জিনতার দীর্ঘ বিরতির পর বড় পর্দায় ফেরা। তাঁর চরিত্র হামিদা দেশভাগের অস্থিরতার মধ্যে পরিবার ও সন্তানদের রক্ষা করার সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেই সময়ের অসংখ্য নারীর অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার চিত্রও উঠে আসে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছর পরও কেন বলিউড বারবার ফিরে যাচ্ছে ১৯৪৭-এর কাছে?

দেশভাগ ছিল নিছক একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ছিল মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া এক বিশাল সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়। ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে নতুন দেশে চলে যেতে বাধ্য হন। সহিংসতায় প্রাণ হারান বিপুল মানুষ, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অসংখ্য পরিবার। বহু মানুষ রাতারাতি হয়ে পড়েন উদ্বাস্তু।

এই কারণেই দেশভাগের স্মৃতি কেবল ইতিহাসের বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ছড়িয়ে পড়েছে পরিবারের গল্পে। কারও দাদার ফেলে আসা বাড়ি, কারও নানির মুখে শোনা সীমান্ত পেরোনোর কাহিনি, কারও হারিয়ে যাওয়া আত্মীয় কিংবা পুরোনো চিঠিতে থাকা একটি ঠিকানা—এসব স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে।

দেশভাগের গল্পে তাই একই সঙ্গে রয়েছে রাজনীতি ও পরিবার, প্রেম ও বিচ্ছেদ, ভয় ও সাহস, মৃত্যু ও নতুন করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। একজন নির্মাতার কাছে এটি রাজনৈতিক ইতিহাস, আরেকজনের কাছে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। আবার কারও কাছে এটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব কিংবা অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প।

দেশভাগ নিয়ে হিন্দি সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ এম এস সত্যুর ‘গরম হাওয়া’। ১৯৭৩ সালের এই সিনেমায় দেশভাগের পর ভারতে থেকে যাওয়া একটি মুসলিম পরিবারের সংকট তুলে ধরা হয়েছিল। বলরাজ সাহনির সালিম মির্জা চরিত্রটি নিজের জন্মভূমি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যেতে চান না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক অবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে তাঁর চারপাশের পৃথিবীকে বদলে দেয়।

‘গরম হাওয়া’র বিশেষত্ব ছিল দেশভাগকে সরাসরি ভারত বনাম পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব তুলে ধরা। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সম্পর্ক ও নিরাপত্তাকে বদলে দিতে পারে, সেটিই হয়ে ওঠে ছবিটির মূল প্রশ্ন।

ভীষ্ম সাহনির উপন্যাস অবলম্বনে গোবিন্দ নিহালনির ‘তমস’ দেশভাগের আরেকটি অন্ধকার দিক সামনে আনে। গুজব, রাজনৈতিক উসকানি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কীভাবে বহুদিনের সহাবস্থানকে ভেঙে দিতে পারে, তার নির্মম চিত্র দেখা যায় এই কাজে।

‘তমস’ মনে করিয়ে দেয়, দেশভাগের সহিংসতা শুধু সীমান্তে ঘটেনি। মানুষের মনেও একটি অদৃশ্য সীমান্ত তৈরি হয়েছিল। গতকাল যে মানুষটি ছিল প্রতিবেশী, পরদিন পরিচয়ের কারণে সে হয়ে উঠতে পারে শত্রু। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই দেশভাগের গল্পকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

খুশবন্ত সিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে পামেলা রুকসের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ দেশভাগের বিশাল ইতিহাসকে একটি ছোট গ্রামের মানুষের জীবনের মধ্যে নিয়ে আসে। পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী কাল্পনিক গ্রাম মানো মাজরায় শিখ ও মুসলিমরা দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাস করলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ধীরে ধীরে সেই স্বাভাবিক জীবনকে ভেঙে দেয়।

এখানে ট্রেন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে ওঠে ভয়, মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির প্রতীক। প্রেম, বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের ওপর যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া পড়ে, তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কও আর নিরাপদ থাকে না।

দীপা মেহতার ‘১৯৪৭: আর্থ’ দেশভাগকে একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে। লাহোরের একদল মানুষের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও স্বাভাবিক জীবন ধীরে ধীরে ধর্মীয় বিভাজনের কারণে ভেঙে পড়ে। ছবিটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরেও বিষ ঢুকিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে ‘পিঞ্জর’ দেশভাগের গল্পকে নারীর জীবন, শরীর ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অমৃতা প্রীতমের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে ঊর্মিলা মাতন্ডকর অভিনীত চরিত্রের জীবনের মধ্য দিয়ে দেখা যায়, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সবচেয়ে গভীর অভিঘাত কীভাবে একজন নারীর ওপর এসে পড়ে।

এই ধরনের সিনেমা দেশভাগের ইতিহাসকে শুধু সীমান্ত, রাজনীতি বা যুদ্ধের মধ্যে আটকে রাখেনি। বরং দেখিয়েছে, একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

২০০১ সালের ‘গদর: এক প্রেম কথা’ দেশভাগের গল্পকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে। সানি দেওলের তারা সিং স্ত্রী ও সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানে পাড়ি দেন। এখানে দেশভাগের বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রেম, অ্যাকশন, পারিবারিক আবেগ এবং জাতীয়তাবাদ।

‘গদর’ দেখিয়ে দেয়, একই ইতিহাসকে ভিন্ন ঘরানায় বলা সম্ভব। কেউ যেখানে দেশভাগের নীরব কান্না দেখেছেন, সেখানে অন্য কেউ সেই ইতিহাসকে বড় পর্দার রোমাঞ্চকর গল্পে পরিণত করেছেন।

২০২৬ সালেও দেশভাগের গল্প নতুনভাবে ফিরে এসেছে। ইমতিয়াজ আলীর ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া প্রেম ও অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ককে সামনে এনেছে। দিলজিৎ দোসাঞ্জ, শর্বরী, বেদাং রায়না ও নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত এই গল্পে একজন বৃদ্ধের স্মৃতির ভেতর দিয়ে বহু বছর আগের এক ভালোবাসা ও ইতিহাসকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।

এখানে স্মৃতি শুধু অতীত মনে রাখার বিষয় নয়। বরং স্মৃতিই হয়ে ওঠে অতীতকে পুনরুদ্ধারের পথ। একজন তরুণ যখন বৃদ্ধের বিচ্ছিন্ন কথাগুলোর অর্থ খুঁজতে থাকে, তখন সে আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া গল্পের সন্ধান করে। সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশভাগের ইতিহাস, মানুষের বিচ্ছেদ এবং ভালোবাসার দীর্ঘস্থায়ী শক্তি।

বলিউডের কাছে দেশভাগ এমন একটি বিষয়, যার ভেতরে অসংখ্য গল্প লুকিয়ে আছে। একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে গল্প বলা যায়, একটি গ্রামের জীবন নিয়ে সিনেমা বানানো যায়, প্রেমের কাহিনি বলা যায়, নারীর সংগ্রাম দেখানো যায় কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা যায়।

তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, দেশভাগের উত্তরাধিকার এখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের স্মৃতিতে ১৯৪৭ এখনো জীবন্ত। ফেলে আসা বাড়ি, হারিয়ে যাওয়া স্বজন, পুরোনো পরিচয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা স্মৃতি আজও সেই সময়ের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করে রেখেছে।

তাই দেশভাগ নিয়ে নতুন সিনেমা আসা মানে শুধু পুরোনো ইতিহাসকে আবার বলা নয়। অনেক সময় এটি বর্তমানকে বোঝারও চেষ্টা। সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সীমান্ত, পরিচয়ের রাজনীতি কিংবা মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস—এসব প্রশ্নের শিকড় খুঁজতে গেলে ১৯৪৭-এর কাছে ফিরে যেতে হয়।

দেশভাগের সবচেয়ে বড় ক্ষত তাই কোনো মানচিত্রে ছিল না। মানচিত্রে সীমারেখা টানা হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সীমান্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যাদের জীবন সেই সীমারেখায় দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল, তাদের গল্প সেদিন শেষ হয়নি।

সেই গল্পই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ফিরে আসে। কখনো বইয়ে, কখনো স্মৃতিতে, কখনো কথায়—আর কখনো সিনেমার পর্দায়।

হয়তো এ কারণেই ৭৯ বছর পরও বলিউডের কাছে ১৯৪৭ একটি পুরোনো গল্প নয়। এটি এমন এক অসমাপ্ত অধ্যায়, যার প্রতিটি চরিত্রের চোখে আজও লুকিয়ে আছে ঘর হারানোর ভয়, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের ভালোবাসাকে ঘৃণার চেয়ে বড় করে দেখার এক অনন্ত চেষ্টা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত