জুলাইয়ে রেমিট্যান্সে শীর্ষে সৌদি আরব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
জুলাইয়ে রেমিট্যান্সে শীর্ষে সৌদি আরব

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক গতি দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। এর বড় একটি অংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি দেশ থেকে। রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাঠিয়েছেন ৫৮ কোটি ৭২ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। মোট রেমিট্যান্সের হিসাবে এটি একক কোনো দেশ থেকে আসা সর্বোচ্চ পরিমাণ।

রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ২৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ একদিকে যেমন পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো প্রয়োজন মেটায়, অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করে বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে রেমিট্যান্স বাড়লে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাইয়ে শীর্ষ ১০টি দেশ থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের ৮৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। এসব দেশ থেকে সম্মিলিতভাবে এসেছে ২৪৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ দেশের মোট প্রবাসী আয়ের বড় অংশই নির্ভর করছে সীমিতসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ শ্রম ও অভিবাসী বাজারের ওপর।

সৌদি আরব থেকে আসা ৫৮ কোটি ৭২ লাখ ৯০ হাজার ডলার এই তালিকায় সবচেয়ে বড় অংশ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটির বিভিন্ন খাতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ। জুলাইয়ে দেশটি থেকে এসেছে ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বড় অংশ যুক্তরাজ্যে বসবাস করায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ২৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার। ফলে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন দেশ থেকেই জুলাইয়ে এসেছে মোট ১২৫ কোটি ৭১ লাখ ডলারের বেশি। দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এই তিন দেশের ওপর নির্ভরশীলতা নির্দেশ করে।

শীর্ষ তালিকায় আরও রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমান, সিঙ্গাপুর ও কাতার। জুলাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। ইতালি থেকে এসেছে ২০ কোটি ৩১ লাখ ডলার এবং মালয়েশিয়া থেকে ২০ কোটি ১৩ লাখ ডলার।

এ ছাড়া কুয়েত থেকে এসেছে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, ওমান থেকে ১৪ কোটি ১৯ লাখ ডলার, সিঙ্গাপুর থেকে ১৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার এবং কাতার থেকে এসেছে ১২ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

এই দেশগুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও আয় দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে আছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও জুলাইয়ে ইতালির অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ইতালি থেকে ২০ কোটি ৩১ লাখ ডলার আসার পাশাপাশি ফ্রান্স থেকে এসেছে ৪ কোটি ৬ লাখ ডলার। পর্তুগাল থেকে এসেছে ১ কোটি ৮১ লাখ ডলার, গ্রিস থেকে ১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার এবং স্পেন থেকে ১ কোটি ২২ লাখ ডলার। জার্মানি থেকেও এসেছে ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার।

ইউরোপের এসব দেশের বাইরে অন্যান্য কয়েকটি দেশ থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য প্রবাসী আয়। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জুলাইয়ে এসেছে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। জর্ডান থেকে এসেছে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২ কোটি ৭১ লাখ ডলার, অস্ট্রেলিয়া থেকে ২ কোটি ১৩ লাখ ডলার এবং কানাডা থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার এসেছে।

অন্যদিকে শীর্ষ ১০ দেশের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সম্মিলিতভাবে এসেছে ৩৯ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের উৎস এখন শুধু কয়েকটি প্রচলিত শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিরাও নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে দেওয়া প্রণোদনা এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এর ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশের পরিমাণ বাড়ছে এবং অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার জোগানই দেয় না; এটি দেশের লাখ লাখ পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বিদেশে থাকা একজন কর্মীর পাঠানো অর্থ অনেক পরিবারের সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি নির্মাণ, কৃষি বিনিয়োগ, ব্যবসা শুরু কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়। গ্রাম ও শহরের বহু পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পেছনেও এই অর্থের ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সের এমন প্রবাহ অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে ডলারের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ ধরে রাখার জন্য বিদেশি শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় আরও স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনেক সময় পরিসংখ্যানের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম, দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতা এবং দেশে থাকা স্বজনদের জন্য ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণশ্রমিক থেকে ইউরোপের কর্মী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী উদ্যোক্তা থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শ্রমজীবী বাংলাদেশি—তাঁদের পাঠানো অর্থই দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

জুলাইয়ের ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স তাই কেবল একটি মাসের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের লাখো পরিবারের প্রত্যাশা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসে সৌদি আরবের নেতৃত্বে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের শুরুতে প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক চিত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রবাহকে টেকসই করা এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুবিধা আরও বাড়ানো। কারণ প্রবাসীদের পাঠানো প্রতিটি অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত লাখো পরিবারের স্বপ্নেরও অংশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত