প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকালে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ ইয়ার্ডে একটি জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার পর এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ ও আহত হয়েছেন। উদ্ধারকাজ চলায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনাটি ঘটে সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলের ওই শিপইয়ার্ডে। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করলে সেখানে থাকা লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। প্রথম দিকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরে মোট নিহতের সংখ্যা সাতজনে পৌঁছায়।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার আগে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসে আক্রান্তদের উদ্ধারে কাজ চলছে। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজের ভেতরে আরও কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার কারণ নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা এটিকে জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে জাহাজে হাউসকিপিংয়ের কাজের সময়। ইয়ার্ডের নিরাপত্তা দল প্রথমে একটি ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গমনের বিষয়টি শনাক্ত করে। পরে বিষয়টি পরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েকজন আক্রান্ত হন। প্রাথমিক পর্যায়ে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং সেখানেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
অন্য একটি বিবরণে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও গ্যাস লিকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় কিছু মানুষ ঘটনাস্থলের কাছে যান। সেখানে জমে থাকা গ্যাসের সংস্পর্শে এসে কয়েকজন হতাহত হন বলে ইয়ার্ড ম্যানেজার দাবি করেছেন। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে কারা এবং কীভাবে গ্যাসের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইয়ার্ড এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, পরে স্থানীয় লোকজনের একটি অংশ সেখানে গিয়ে ভাঙচুর চালায় এবং বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়। তবে এই ঘটনারও বিস্তারিত পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। পরিত্যক্ত ও স্ক্র্যাপ জাহাজে বিভিন্ন ধরনের অবশিষ্ট রাসায়নিক, জ্বালানি, গ্যাস কিংবা অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ থাকার সম্ভাবনা থাকে। এসব জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও বদ্ধ জায়গা নিরাপদ কি না, গ্যাসমুক্ত করা হয়েছে কি না এবং সেখানে কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ট্যাংক, বদ্ধ কক্ষ কিংবা জাহাজের ভেতরের কম বায়ু চলাচলকারী স্থানে গ্যাস জমে থাকলে তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন হতে পারে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া সেখানে প্রবেশ করলে শ্রমিক বা অন্য কেউ আকস্মিকভাবে বিপদের মুখে পড়তে পারেন। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা দল, গ্যাস শনাক্তকরণ যন্ত্র, যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমুদ্রপথে চলাচল শেষ করা বড় জাহাজগুলো পুনর্ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ লোহা ও অন্যান্য ধাতু পাওয়া যায়। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও জড়িত। একই সঙ্গে এ খাতে পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তার ঝুঁকিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।
সীতাকুণ্ডের উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে ভারী ধাতু, পুরোনো জাহাজের যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয়। ফলে এখানে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। শুক্রবারের ঘটনাটি সেই ঝুঁকির ভয়াবহ দিকটি আবার সামনে এনেছে।
এ ঘটনায় নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি দুর্ঘটনার পর শুধু মৃতের সংখ্যা জানানোই শেষ দায়িত্ব নয়; আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে গ্যাসের উৎস, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জাহাজের ট্যাংকের অবস্থা এবং দুর্ঘটনার সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুক্রবারের এই ঘটনায় সাতটি প্রাণ ঝরে গেছে। তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে ছিল একটি পরিবার, স্বজনদের প্রত্যাশা এবং জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জীবন। একটি শিপইয়ার্ডে কাজ করতে গিয়ে কর্মী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি যেন আর এমন ঝুঁকির মুখে না পড়েন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দুর্ঘটনার পর দায়িত্বশীল তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে শুধু এই ঘটনার কারণই স্পষ্ট হবে না, ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানোর পথও তৈরি হতে পারে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে কাজের আগে যথাযথ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা—এখন তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে গ্যাস দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু তাই শুধু একটি দিনের মর্মান্তিক ঘটনা নয়। এটি আবারও মনে করিয়ে দিল, শিল্পের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শ্রমিক ও মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি।