প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের রাজধানী ফয়জাবাদের মেয়র হাবিব-উর-রহমান মনসুর বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে শহরের শাহার-ই কোহনা এলাকায় পৌর ভবনের কাছে তার গাড়ি লক্ষ্য করে এ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। হামলায় মেয়রের কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীও নিহত হয়েছেন।
হাসপাতাল ও পৌরসভার সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মেয়রের গাড়ি ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় আগে থেকে পুঁতে রাখা একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে গাড়িতে আগুন ধরে যায় এবং সেটি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় মেয়রকে বাদাখশান প্রাদেশিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে তিনি মারা যান।
হামলার ঘটনাটি ঘটেছে ফয়জাবাদ শহরের এমন একটি এলাকায়, যা প্রাদেশিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাদাখশান গভর্নরের কার্যালয় থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরেই বিস্ফোরণটি ঘটে। ফলে হামলার পরপরই ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের শব্দ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। বিস্ফোরণের পর মেয়রের গাড়িতে আগুন ধরে যায়। ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা এলাকা ঘিরে ফেলেন এবং আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
মেয়র হাবিব-উর-রহমান মনসুরের জন্মস্থান ছিল আফগানিস্তানের ময়দান ওয়ারদাক প্রদেশে। তিনি ফয়জাবাদ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনে তার দায়িত্ব ছিল শহরের নাগরিক সেবা ও পৌর কার্যক্রম পরিচালনা করা। কর্মস্থলের কাছেই তাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট বা এনআরএফ। তালেবান সরকারের বিরোধী এই সশস্ত্র গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা মেয়রের গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার বিষয়ে তালেবান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাদাখশানে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নিরাপত্তা ঘটনার মধ্যে মেয়র মনসুরের হত্যাকাণ্ড নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে, গত ২৮ জুলাই একই শহরে গুলিতে নিহত হন বাদাখশান প্রদেশের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান জাবিহুল্লাহ আমিরি।
তালেবান পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিজ কার্যালয়ে যাওয়ার পথে বাহারক-ফয়জাবাদ সড়কে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি আমিরির ওপর হামলা চালান। পরে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান বা আইএসকে ওই হত্যার দায় স্বীকার করে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রদেশটির দুই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বড় ধরনের যুদ্ধের মাত্রা আগের তুলনায় কমেছে। তবে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইসলামিক স্টেট-খোরাসানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তালেবানবিরোধী অন্যান্য গোষ্ঠীও কিছু এলাকায় হামলা পরিচালনা করছে।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট তালেবানবিরোধী অন্যতম পরিচিত সশস্ত্র সংগঠন। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কথা বলে আসছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশটির ওপর তালেবানের নিয়ন্ত্রণকে বড় ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারেনি তারা। বিচ্ছিন্ন হামলা চালাতে সক্ষম হলেও এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম এখনো মূলত সীমিত পরিসরে রয়েছে।
বাদাখশান ভৌগোলিকভাবেও আফগানিস্তানের অন্যতম দুর্গম ও পাহাড়ি অঞ্চল। তাজিকিস্তান, চীন ও পাকিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে প্রদেশটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটি বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদের জন্যও পরিচিত। তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর বাদাখশানের খনিজ সম্পদকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতিও প্রদেশটির জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো সেই দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসেও বাদাখশানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আফিমের পোস্তখেত ধ্বংসের জন্য পরিচালিত অভিযানের সময় ওই সংঘর্ষ হয়। এতে এক কিশোরসহ দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ সরকারি নিরাপত্তা অভিযান, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা—সব মিলিয়ে প্রদেশটির পরিস্থিতি বেশ জটিল।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও সহিংসতার পুরোপুরি অবসান হয়নি। বিশেষ করে আইএসকে তালেবান সরকারের জন্য অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
আইএসকে শুধু তালেবান কর্মকর্তাদের নয়, বিদেশি নাগরিক, কূটনৈতিক স্থাপনা, ধর্মীয় স্থান এবং বিভিন্ন জনবহুল এলাকাকেও লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সংগঠনটির তৎপরতার কারণে কাবুলের মতো তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত এলাকাতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বাদাখশানের মেয়র হত্যার ঘটনাও তাই শুধু স্থানীয় একটি হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রাদেশিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা হলে তা স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। শহরের নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।
তালেবান কর্তৃপক্ষ অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে তারা আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা সেই দাবির সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ফয়জাবাদের এই বিস্ফোরণের পর এখন হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে বাদাখশানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একজন স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দিনের বেলায় কর্মস্থলের কাছে গাড়িসহ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনায় ফয়জাবাদের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একই শহরে দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার মৃত্যু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মেয়র হাবিব-উর-রহমান মনসুরের মৃত্যু তাই বাদাখশানের প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য যেমন একটি বড় ধাক্কা, তেমনি প্রদেশটির চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। তালেবান সরকার দেশজুড়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও বাদাখশানের মতো কৌশলগত অঞ্চলে ধারাবাহিক সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।