ছাত্রদল থেকে বিদায়ের ঘোষণা নাছির উদ্দীন নাছিরের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
ছাত্রদল থেকে বিদায়ের ঘোষণা নাছির উদ্দীন নাছিরের

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির তাঁর বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে তিনি জানান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৪ আগস্টই তাঁর দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, সংগঠনের দায়িত্ব, আন্দোলন-সংগ্রাম, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাটানো নানা স্মৃতিচারণ করে তিনি বিদায়ী বক্তব্য দিয়েছেন।

নাছিরের এই ঘোষণায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক অঙ্গনে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যে কোনো নতুন দায়িত্ব বা পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, সহযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি আস্থার কথাই তুলে ধরেছেন তিনি।

নাছির উদ্দীন নাছিরের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ওয়ান-ইলেভেনের সময়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর প্রায় ১৭ বছর ধরে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁকে পথ চলতে হয়েছে। বিদায়ের মুহূর্তে তিনি রাজনৈতিক জীবনে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তখন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন—এমনটি কখনো ভাবেননি বলেও নিজের বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল পদ-পদবির বিষয় নয়; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সংকটের সময়ে সহযোদ্ধাদের সাহস দেওয়া এবং নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের পক্ষে কাজ করে যাওয়ার দীর্ঘ পথ।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও তাঁর সামনে ছিল কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের ১ মার্চ তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। তাঁর দায়িত্বকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। নাছিরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, সংগঠনের বিভিন্ন স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং কর্মীদের সাহস জোগানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন বলে দাবি করেন নাছির। ঢাকার পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচটি কলেজ এবং চারটি মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার কথাও তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস কেবল পরিচিত কয়েকজন নেতার নাম দিয়ে লেখা হয় না; এর পেছনে থাকে অসংখ্য পরিচয়হীন তরুণের ত্যাগ, সাহস ও আত্মত্যাগ।

আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ছাত্রনেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও নিজের বিদায়ী বক্তব্যে তুলে ধরেন নাছির। তিনি নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের নাম উল্লেখ করে জানান, আন্দোলনের কঠিন সময়ে তাঁদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলের ভূমিকা সবসময় একইভাবে স্বীকৃতি না পেলেও সংকটের সময়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

আন্দোলনের পরপরই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার প্রসঙ্গও উঠে আসে নাছিরের বক্তব্যে। তিনি জানান, নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলের বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকেও ফেনীতে গিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা পান তিনি।

নাছিরের ভাষায়, সেই নির্দেশনা পাওয়ার পর রাতেই তিনি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন। পরে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারাও বৃহত্তর নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলে ছুটে যান। এই অভিজ্ঞতাকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে নাছির বলেন, রাজনীতি শুধু মিছিল, সভা কিংবা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক চাপ, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং তথাকথিত ‘মব সংস্কৃতি’ মোকাবিলাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন নাছির। তাঁর মতে, এসব পরিস্থিতির মধ্যেও ছাত্রদলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা সহজ ছিল না। একই সঙ্গে সংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের দায়িত্বকালের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাছির জানান, এ সময়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এটিকে নিজের একক সাফল্য হিসেবে দেখেন না তিনি। তাঁর মতে, এসব অর্জনের পেছনে ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত শ্রম ও প্রচেষ্টা রয়েছে।

তবে সব কাজ সম্পূর্ণ করতে না পারার আক্ষেপও রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারায় নিজের অপূর্ণতার কথা স্বীকার করেছেন নাছির। একই সঙ্গে যারা বিভিন্ন কমিটিতে পদ পেয়েছেন এবং যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদ পাননি, উভয় পক্ষের প্রতিই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি।

নাছিরের মতে, কোনো একটি পদ একজন রাজনৈতিক কর্মীর যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। যাঁরা কোনো কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাঁদের অনেকেই ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াকেও নিজের দায়িত্বকালের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন নাছির। একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল তাঁকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে বলে জানান তিনি। কোথায় ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা সম্ভব ছিল—এসব নিয়ে আত্মসমালোচনার কথাও বলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পরাজয়কে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে ভবিষ্যতে ছাত্রদল আরও সংগঠিত ও গ্রহণযোগ্য সংগঠনে পরিণত হবে বলে আশা তাঁর।

বিদায়ী বক্তব্যে বিএনপি ও ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নাছির। খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল বকুলসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।

নিজের দায়িত্বকালের মূল্যায়নে নাছির কোনো ভুল বা সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকলে তা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সব সিদ্ধান্ত হয়তো নিখুঁত ছিল না এবং কোথাও কোথাও ঘাটতিও ছিল। তবে সংগঠনের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তাঁর কখনো ছিল না—এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।

সবচেয়ে আবেগঘন অংশে নাছির স্পষ্ট করেছেন, তিনি একটি পদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, ছাত্রদল থেকে নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সংগঠনটি যে পরিচয়, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক ও ভালোবাসা দিয়েছে, সেটিকে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি। দায়িত্ব পালনের সময়ে তাঁর কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে কিংবা কোনো সিদ্ধান্তে কেউ অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তিনি সহযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা ও কঠিন সময়গুলো নীরবে সহ্য করা পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন নাছির। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ভূমিকাও স্মরণ করেছেন তিনি। তাঁদের প্রশংসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমালোচনাও রাজনৈতিক সংগঠনকে নিজেদের ভুল বুঝতে সহায়তা করে বলে মনে করেন তিনি।

নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে নাছির বলেন, তাঁর বিদায়ের পর ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব আসবে এবং সেই নেতৃত্বের অধীনে সংগঠন আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে। প্রয়োজন হলে নতুন নেতৃত্বের ডাকে আগের মতোই পাশে থাকার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক অধ্যায় শেষ হওয়ার আবেগ এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। নাছির উদ্দীন নাছিরের জন্য ১৪ আগস্ট হয়তো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেষ কর্মদিবস। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায়, পদ থেকে বিদায় নেওয়া সম্ভব হলেও আদর্শ, সম্পর্ক, সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে বিদায় নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক—এমন প্রত্যাশা জানিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন নাছির। জীবনের কোনো এক পর্যায়ে সুখী, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখার স্বপ্নের কথাও জানান তিনি। ছাত্রদল সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক সংগ্রামে ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর বিদায়ী বক্তব্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত