প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নাগরিক অধিকার আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী দাবি উত্থাপন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, প্রবাসীদের ভোটাধিকারের সুযোগ কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী করার জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য। বর্তমান বিএনপি সরকার প্রবাসীদের এই রাজনৈতিক অধিকার প্রদানে অনীহা প্রকাশ করছে অভিযোগ করে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভোটার ১১-দলীয় জোটের পক্ষে রায় দেওয়ায় এবং ভোট প্রদান করায় বর্তমান সরকার কৌশলে প্রবাসীদের রাজনৈতিক শক্তিকে ভয় পাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দশম অ্যারোন্ডিসমেন্টের একটি অভিজাত হোটেলে ‘এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স ফ্রান্স শাখা’র উদ্যোগে আয়োজিত ‘রিমেম্বারিং জুলাই হিরোজ’ শীর্ষক এক স্মরণসভা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এই বিস্ফোরক ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
ফ্রান্সের মাটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন যে, সরকার জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার নাম করে স্থানীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়টি থেকে কৌশলে দূরে সরে থাকতে চাইছে। সম্প্রতি বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিবের রংপুর বিভাগীয় সফর ও বক্তব্য ঘিরে প্রবাসীদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে দলটির মূল অবস্থান ও ভীতি স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা অভিযোগ করেন যে, বর্তমান বিএনপি সরকার ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত গণভোটের ঐতিহাসিক রায়কে অস্বীকার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ দেশের সাধারণ মানুষের মনে এই সরকারের ওপর আস্থার চরম সংকট তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের এই অনাস্থা ও আস্থার ঘাটতি গণতন্ত্রের জন্য কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ নয় বলে তিনি সতর্ক করে দেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র একটি প্রতীকী সরকার পরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার হাতবদলই জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের মূল লক্ষ্য ছিল না। একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে কাঠামোগত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনা ছাড়া জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হতে পারে না।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন যে, দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও দেশের বর্তমান অর্থনীতিকে আগের মতো ফ্যাসিবাদের আমলের ধারাবাহিকতায় কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কুক্ষিগত করে রাখা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটভিত্তিক ও শোষক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রেখে কখনো জনগণের কল্যাণ সাধন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন যে, সর্বাগ্রে এই ফ্যাসিবাদী কাঠামোগত ব্যবস্থার স্থায়ী ও দৃশ্যমান বিলোপ সাধন করতে হবে। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সভার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং এর পরপরই পবিত্র জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর বৈষম্যবিরোধী জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স ফ্রান্স শাখার আহ্বায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ ইফতেশামের সভাপতিত্বে অত্যন্ত আড়ম্বরমপূর্ণ এই সভাটি অত্যন্ত সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ সদস্য তাওহিদা বেগম। সভার শুরুতেই সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব কাউসার আহমেদ একটি নাতিদীর্ঘ স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন এবং উপস্থিত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উক্ত স্মরণসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশি নাগরিক পরিষদ ফ্রান্স শাখার সম্মানিত সভাপতি আবুল খায়ের লস্কর এবং এনসিপি গ্লোবাল ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্সের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হওয়া সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সাবন্তি এবং বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের গুম ও বিভীষিকাময় ‘আয়নাঘর’-এর নৃশংসতার শিকার ভুক্তভোগী মসরুর আনোয়ার চৌধুরী সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তাদের আবেগঘন ও মননশীল বক্তব্যে জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করেন। এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স ফ্রান্স শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মনোয়ার পাটোয়ারী তার বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, জুলাই সনদ এবং জনগণের প্রত্যক্ষ গণভোটের ঐতিহাসিক রায় যদি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে এ দেশের দেশপ্রেমিক জনতা ছাত্র-জনতার অসমাপ্ত বিপ্লব যেকোনো মূল্যে নিজেদের হাতে সম্পন্ন করতে বাধ্য হবে। সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে চৌধুরী মোহাম্মদ ইফতেশাম বলেন যে, প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানো মেশিন নন, বরং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় এক কোটি প্রবাসী এই বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ও প্রতিনিধি। দেশমাতৃকার অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি এর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে এবং জুলাই বিপ্লব আমাদের সেই কাজের অনন্ত অনুপ্রেরণা জোগায়।

ফ্রান্সের স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সরব উপস্থিতিতে সভাটি একপর্যায়ে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। অনুষ্ঠানে ফ্রান্সে বসবাসরত বিশিষ্ট প্রবাসীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিপি ফ্রান্স শাখার নিবেদিতপ্রাণ সদস্য ডা. মাজহারুল তালুকদার, মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম, ইমাদ উদ্দিন, সাকিব হোসেন ইবন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, রাজপথের পরীক্ষিত অ্যাক্টিভিস্ট খালেদ মাহমুদ, সাকিব সিদ্দিকী, ওয়াদুদ তানভীর, আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ আফ্রিদ ও ইকরামুল কবির সালমানসহ আরও অনেকে। বক্তারা প্রত্যেকেই প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় এবং জুলাইয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে প্রবাস থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নাহিদ ইসলামের এই দাবি প্রবাসীদের মাঝে নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে এবং আগামী দিনে স্থানীয় নির্বাচনেও ভোটাধিকার আদায়ের এই আন্দোলন আরও বেগবান হবে বলে সভায় উপস্থিত নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।