রাষ্ট্রপতির পথে মির্জা ফখরুল, ভোটের অপেক্ষা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
রাষ্ট্রপতির পথে মির্জা ফখরুল, ভোটের অপেক্ষা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা পড়ার পর এখন মূল আলোচনায় রাষ্ট্রপতি ভবন বঙ্গভবন। সংসদে বিএনপির শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তবে সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপ এখনো বাকি রয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কারণে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।

এরপর বিএনপির প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তাঁর মনোনয়নপত্রের প্রস্তাবক হিসেবে রয়েছেন আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষেও দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে—মির্জা ফখরুলের একটি এবং অলি আহমদের দুটি।

এর ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্যেও ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী এই ভোট প্রকাশ্য এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়ার সময় ভোটারের পরিচয়ও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করা হয়।

এই ব্যবস্থাই এবারের নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য জয়ের সমীকরণকে অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা ২৪৭। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০। ফলে ভোটের অঙ্কে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। তবে ভোটের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। আর একজন প্রার্থী বৈধ থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনেও একমাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণার বিধান রয়েছে।

এবারের নির্বাচনের আরেকটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। বিরোধী জোটের প্রার্থী অলি আহমদও জানেন, সংসদের সংখ্যার বিচারে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। তারপরও তাঁকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিরোধী পক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনে পরিণত হতে দিতে চাইছে না। রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনও দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। একসময় তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রীও হন। ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগে তাঁর দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যুক্ত হয়।

অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির জীবন পেরিয়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতি, পৌরসভা, সংসদ এবং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন। ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ সময় ধরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও তাঁর তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসার এই দীর্ঘ পথচলার কথা উঠে এসেছে।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে গেলে শুধু বিএনপির মহাসচিবের পদই শূন্য হবে না, তাঁর বর্তমান মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ সদস্যপদ নিয়েও নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংবিধান অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।

এই জায়গাতেই এখন ‘তিন পদ’ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা তীব্র হয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে প্রথমত বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয়ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্ধারণ করতে হবে। তৃতীয়ত ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রশ্ন সামনে আসবে। অর্থাৎ একজন রাজনীতিকের রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে দল, সরকার ও সংসদ—তিন ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের পরিবর্তনের দরজা খুলে দিচ্ছে।

বিএনপির অভ্যন্তরে নতুন মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়েও ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে নেতারা জানিয়েছেন। দলীয় কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী ঘোষণার আগে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়েও গুঞ্জন তৈরি হয়। তবে বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির একাধিক নেতা স্পষ্ট করেছেন, সেখানে কোনো স্থায়ী কমিটির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি এবং মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়েও আলোচনা হয়নি। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা এবং মনোনয়নপত্র দাখিলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা।

রাষ্ট্রপতি পদটি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। আর ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।

সব মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের সম্ভাবনা, অন্যদিকে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফলের সম্ভাব্য চিত্র—দুই বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে। ফলে ২০ আগস্টের ভোট কেবল একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে না; এর মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ও দলের নেতৃত্ব কাঠামোতেও একটি নতুন বিন্যাসের সূচনা হতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হচ্ছেন কি না, তার আনুষ্ঠানিক উত্তর মিলবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের ধাপ পেরিয়ে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির নাম। আপাতত রাজনৈতিক অঙ্গনে সেই অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দীর্ঘদিনের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত