৮১তম বছরে পা দিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
৮১তম বছরে পা দিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যেসব শিল্পীর নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয়, শবনম তাঁদের অন্যতম। অভিনয়, সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও পর্দায় উপস্থিতির স্বতন্ত্রতায় তিনি কয়েক দশক ধরে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তৎকালীন পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্রেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী। আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জন্মদিন। ১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া শবনম ৮০ বছর পূর্ণ করে জীবনের ৮১তম বছরে পা দিলেন।

শবনমের চলচ্চিত্রজীবনের শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। সে সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন ছিল বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে শবনম খুব দ্রুতই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হন। ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দর্শকের নজরে আসেন। চলচ্চিত্রটির সাফল্যের সঙ্গে শবনমের নামও ছড়িয়ে পড়ে দেশের দর্শকদের মধ্যে। তার অভিনয় ও পর্দার উপস্থিতি তখনকার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ছিল নতুন এক আকর্ষণ।

‘হারানো দিন’-এর পর শবনমের ক্যারিয়ার আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উর্দু ভাষার ‘চান্দা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের বৃহত্তর চলচ্চিত্র বাজারেও পরিচিতি অর্জন করেন। বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি উর্দু সিনেমায় দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া তার ক্যারিয়ারকে নতুন মাত্রা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

শবনমের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭০ সালে। ওই সময় তিনি ঢাকা ছেড়ে লাহোরে পাড়ি জমান এবং পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। সেখানে তার অভিনয়জীবন দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যায়। উর্দু চলচ্চিত্রের পাশাপাশি পাকিস্তানের দর্শকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল যে তিনি সেখানকার চলচ্চিত্রশিল্পের অন্যতম পরিচিত নারী তারকায় পরিণত হন।

পাকিস্তানে নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি স্মৃতি এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছিলেন শবনম। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাকিস্তানে প্রথম চলচ্চিত্রের সম্মানী দিয়ে তিনি কী করেছিলেন। উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, সম্মানীর সঠিক পরিমাণ তার মনে নেই। তবে ওই অর্থ দিয়ে করাচিতে দুই বেডরুমের একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলেন বলে স্মরণ করেন তিনি। সে সময় তার মা-বাবা ও ছেলে রনি ঢাকায় ছিলেন। বাড়ি কেনার পর তাঁদেরও তিনি পাকিস্তানে নিয়ে যান।

এই স্মৃতিচারণ শবনমের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাফল্যের একটি দিক তুলে ধরে। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি যে পর্যায়ের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তার প্রতিফলন পাওয়া যায় জীবনের এমন নানা ঘটনায়। করাচির সেই বাড়িতে মা-বাবা ও সন্তানকে নিয়ে থাকার স্মৃতি তার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

ঢাকার চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ারের শুরুর সময়টিও শবনমের কাছে ছিল বিশেষ স্মৃতিময়। ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি এক হাজার ২০০ টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন। সেই পুরো অর্থ তিনি মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম দিকের এই ঘটনা তার পারিবারিক বন্ধন ও মায়ের প্রতি ভালোবাসার কথাও মনে করিয়ে দেয়। একই সময়ে ‘এ দেশ তোমার আমার’ ও ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও এসব ছবির জন্য তিনি কোনো সম্মানী পাননি বলে জানিয়েছিলেন।

ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নিয়মিত অভিনয় করেছেন শবনম। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার চলচ্চিত্রেই তিনি নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। তার অভিনয়ের ধরন ছিল স্বতন্ত্র। রোমান্টিক চরিত্রের পাশাপাশি আবেগঘন ও পারিবারিক গল্পের চরিত্রেও তিনি দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। তার অভিনয়জীবনের সঙ্গে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের একটি পরিবর্তনশীল সময়ও জড়িয়ে রয়েছে।

শবনমের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় দিক ছিল তার আন্তঃদেশীয় পরিচিতি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন শিল্পী হয়েও পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে তিনি দীর্ঘদিন শীর্ষ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন। সে সময় দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমনই থাকুক না কেন, চলচ্চিত্রের পর্দায় শবনম ছিলেন দর্শকের ভালোবাসার একটি পরিচিত নাম। বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে তার সফল উপস্থিতি তাকে অন্য অনেক সমসাময়িক শিল্পীর চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের শেষদিকে শবনম আবার বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ‘আম্মাজান’ নামটি তার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে যায় যে অনেক দর্শক পরবর্তী সময়েও তাকে এই নামেই স্মরণ করেছেন।

‘আম্মাজান’ ছিল শবনমের অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। এরপর তিনি নিয়মিত অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তবে পর্দা থেকে দূরে থাকলেও দর্শকের স্মৃতি থেকে কখনো হারিয়ে যাননি। তার অভিনীত পুরোনো চলচ্চিত্র, গান এবং বিভিন্ন চরিত্র এখনো চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আগ্রহের বিষয়। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকও বিভিন্ন মাধ্যমে তার পুরোনো কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তার অভিনয়জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

শবনমের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও চলচ্চিত্রের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক ও সুরকার রবিন ঘোষকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের একমাত্র ছেলে রনি। অভিনয়জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি তার টান বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। ক্যারিয়ারের শুরুর উপার্জন মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার স্মৃতিও তার জীবনের আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি।

শবনমের ক্যারিয়ার শুধু একজন জনপ্রিয় নায়িকার সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দলিলও। যে সময়ে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি, নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের ধরন আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল, সে সময় দীর্ঘদিন দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখা সহজ ছিল না। তবু শবনম নিজের অভিনয়গুণ ও তারকা ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সেই সময়ের দর্শকের কাছে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

আজ তার জন্মদিনে ফিরে দেখা হচ্ছে সেই দীর্ঘ পথচলা। একদিকে ‘হারানো দিন’-এর তরুণী অভিনেত্রী, অন্যদিকে পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা; আবার ক্যারিয়ারের শেষদিকে ‘আম্মাজান’ চরিত্রে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পরিচিত মুখ—শবনমের এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দিয়েছে।

সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে। বদলে গেছে সিনেমা দেখার মাধ্যমও। কিন্তু শবনমের মতো শিল্পীদের রেখে যাওয়া কাজের আবেদন অনেক সময় প্রজন্মের ব্যবধানও অতিক্রম করে। তার অভিনীত চরিত্র ও চলচ্চিত্র এখনো চলচ্চিত্রের ইতিহাস, স্মৃতি ও দর্শকের আবেগের অংশ হয়ে আছে।

৮০ বছর পূর্ণ করে ৮১তম বছরে পা রাখার এই দিনে তাই কিংবদন্তি শবনমকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি যে জনপ্রিয়তা ও সম্মান অর্জন করেছেন, সেটিই তাকে আজও আলাদা করে রাখে। বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের দুই ভুবনে সমানভাবে আলো ছড়ানো এই অভিনেত্রীর নাম তাই দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত