সিরিয়া-গাজা-লেবাননের পাশে থাকার অঙ্গীকার এরদোয়ানের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
সিরিয়া-গাজা-লেবাননের পাশে থাকার অঙ্গীকার এরদোয়ানের

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের প্রতি তুরস্কের সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, সিরিয়া সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। আঞ্চলিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তুরস্কের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ, গাজায় সংঘাত এবং লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

সিরিয়া প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আঙ্কারা সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তুরস্ক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে যাবে বলে জানান তিনি।

এরদোয়ান বলেন, সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; দুই দেশের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সিরিয়ার শান্তি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তুরস্ক সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। তিনি নিজেও শিগগির সিরিয়া সফরের পরিকল্পনা করছেন বলে জানান।

তুরস্কের রাষ্ট্রদূত নুহ ইয়িলমাজও এর আগে আশা প্রকাশ করেছেন, চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই এরদোয়ান দামেস্ক সফর করতে পারেন। এমন সফর বাস্তবায়িত হলে সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়েও আলোচনা এগিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ানের বক্তব্য আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি তুরস্কের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে গাজায় চলমান মানবিক সংকট এবং সামরিক সংঘাত নিয়ে আঙ্কারা যে অবস্থান নিয়ে আসছে, তাতে কোনো পরিবর্তন হবে না বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির শর্ত না মানার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে হামাস তাদের প্রতিশ্রুতি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর তুরস্ক বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

এরদোয়ানের বক্তব্যে গাজা ইস্যুতে তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতাও স্পষ্ট হয়েছে। আঙ্কারা ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং গাজার সাধারণ মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে নতুন করে গাজা নিয়ে এরদোয়ানের মন্তব্য তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সামনে এনেছে।

লেবাননের পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষায়, দেশটিতে ইসরাইলের হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। লেবাননের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে সংঘাত বাড়লে পুরো অঞ্চলে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে আঙ্কারা।

এরদোয়ান জানান, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি দিকও সামনে এসেছে। যদিও দুই দেশের মধ্যপ্রাচ্যনীতি সব বিষয়ে অভিন্ন নয়, তবু সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে মিসরও এই উদ্যোগে যুক্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংঘাত, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে পরিবর্তিত কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকে নজর রয়েছে।

এরদোয়ান বলেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার সময় তুরস্ক তার প্রতিবেশীদের একা ছেড়ে যাবে না। সিরিয়া, গাজা ও লেবাননে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আঙ্কারা সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। তাঁর বক্তব্যে তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সিরিয়া, গাজা ও লেবানন—তিনটি অঞ্চলই বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সিরিয়ায় দীর্ঘ সংঘাতের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে লেবাননও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে তিনটি ক্ষেত্রেই তুরস্কের অবস্থান দেশটির বৃহত্তর আঞ্চলিক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ দেশটিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ দিয়েছে। এরদোয়ান সরকারের নীতিতে একদিকে ফিলিস্তিনের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন, অন্যদিকে সিরিয়ার পুনর্গঠন ও নিরাপত্তায় অংশগ্রহণ এবং লেবাননের স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে আঙ্কারার মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

তবে এই নীতির বাস্তবায়ন সহজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বার্থ, সামরিক সংঘাত, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় তুরস্কের ঘোষিত সহযোগিতা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর।

এরদোয়ানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট থেকে তুরস্ক নিজেকে দূরে রাখতে চাইছে না। বরং সিরিয়া থেকে গাজা এবং লেবানন পর্যন্ত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আলোচনায় নিজেদের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে আঙ্কারা। আগামী মাসগুলোতে এরদোয়ানের সম্ভাব্য সিরিয়া সফর এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত