৭০ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আদেশ কাল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
৭০ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আদেশ কাল

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিধানসংবলিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে করা রিটের ওপর আগামীকাল মঙ্গলবার আদেশ দেবেন হাইকোর্ট। ফলে বহুল আলোচিত এই রিটের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর রয়েছে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের।

সোমবার রিটটির শুনানি শেষে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ গত ১৩ আগস্ট রিটটি দায়ের করেন। শুনানিতেও তিনি নিজেই আবেদনকারীর পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁকে সহযোগিতা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী এবং আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব।

শুনানি শেষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব জানান, আদালত রিটের ওপর আদেশের জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করেছেন।

এই রিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দলীয় শৃঙ্খলা ও সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক রয়েছে, ৭০ অনুচ্ছেদ তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এই বিধানের কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এ কারণে ওই ব্যক্তি পরবর্তী কোনো সংসদ নির্বাচনে সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের বর্তমান আসন হারানোর বিধান থাকলেও ভবিষ্যতে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি অযোগ্যতা তৈরি হয় না।

রিট আবেদনে এই বিধান সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে আদালতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না।

এর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল নিয়েও রিটে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গত ৬ আগস্ট তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

রিটে ৬ আগস্ট ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করার বিষয়ে রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদনও করা হয়েছে।

ফলে মঙ্গলবার হাইকোর্টের আদেশে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে রিটটি কীভাবে এগোবে তা নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের আবেদন নিয়ে আদালতের অবস্থানও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণের তারিখ সামনে থাকায় আদালতের আদেশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে তফসিল, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে তা রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি আইন ও সাংবিধানিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে এর আগেও আদালতে মামলা হয়েছে। আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এর আগে একই অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন। ২০১৮ সালে ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত আদেশ দিয়েছিলেন।

ওই বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুল জারি করেছিলেন। অপর বিচারপতি রিটটি খারিজ করে দেন। পরে বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এটি হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চে পাঠান। এই বেঞ্চটি তৃতীয় বেঞ্চ হিসেবে পরিচিত হয়। একই বছরের ১৮ মার্চ ওই একক বেঞ্চ রিটটি খারিজ করে আদেশ দেন।

এবার একই আইনজীবীর করা নতুন রিটে ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতার প্রশ্নটি আবারও আদালতের সামনে এসেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ফলে আগের মামলার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান আবেদনের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক নিয়েও আইন অঙ্গনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় দলীয় সংহতি বজায় রাখার অন্যতম সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আবার সমালোচকদের একটি অংশের মতে, এই বিধান সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করে। একজন সংসদ সদস্য নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থ বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ঝুঁকির মুখে পড়েন।

অন্যদিকে দলীয় রাজনীতির স্থিতিশীলতা ও সংসদীয় সরকারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থান অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে। ফলে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কটি কেবল একটি সাংবিধানিক বিধানের বৈধতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সংসদ সদস্যের স্বাধীনতা, দলীয় গণতন্ত্র এবং সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার বিষয়ও যুক্ত।

বর্তমান রিটের শুনানিতে এসব সাংবিধানিক প্রশ্নের কোন দিকগুলো আদালতের বিবেচনায় এসেছে, তা মঙ্গলবারের আদেশের পর আরও পরিষ্কার হতে পারে। আদালত রিটটি গ্রহণ করে পরবর্তী শুনানির জন্য রুল জারি করেন কি না, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের আবেদন বিবেচনা করেন কি না কিংবা আবেদনটি কোনো পর্যায়ে খারিজ করেন কি না—সবকিছুই এখন আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্ধারিত সময় খুব কাছাকাছি হওয়ায় রিটটির ওপর দ্রুত আদেশের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণের আগে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হলে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

তবে আদালতের চূড়ান্ত আদেশ না আসা পর্যন্ত রিটে উত্থাপিত অভিযোগ বা প্রশ্নকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের আইনগত অবস্থান—উভয় বিষয়েই শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরবর্তী আইনি পথ।

এখন মঙ্গলবারের আদেশের দিকে তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী সমাজ এবং সাংবিধানিক বিষয়ে আগ্রহী বিভিন্ন মহল। আদালতের সিদ্ধান্তে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে কোনো সাংবিধানিক বিতর্কের দ্বার খুলবে কি না, নাকি বর্তমান রিটই প্রাথমিক পর্যায়ে থেমে যাবে—তা জানা যাবে আগামীকাল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত