৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে কানাডা, শেষ চেষ্টায় চুক্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে কানাডা, শেষ চেষ্টায় চুক্তি

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন নতুন করে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার থেকে কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অনিশ্চয়তা। শেষ মুহূর্তে একটি সমঝোতায় পৌঁছে শুল্কের বড় ধাক্কা এড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কানাডা। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চললেও এখনো এমন কোনো চুক্তি হয়নি, যা পরিস্থিতিকে নিশ্চিতভাবে স্বাভাবিক করার মতো।

কানাডার জন্য এবারের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য, কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণ সীমান্ত পেরিয়ে যায়। কানাডার গাড়ি শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, জ্বালানি, খাদ্য ও ভোক্তা পণ্য—অসংখ্য খাত মার্কিন বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ হলে শুধু রপ্তানিকারকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।

গত তিন সপ্তাহে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। অটোয়ার আলোচকেরা চেষ্টা করছেন, অন্তত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে যাতে বুধবার থেকে নির্ধারিত শুল্ক পুরোপুরি কার্যকর না হয়। কিন্তু আলোচনার টেবিলে একাধিক জটিল বিষয় রয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। বিশেষ করে গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহল খাতে কানাডার নীতিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ব্যবসার জন্য বাধা হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে কানাডার অবস্থান হলো, দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্যিক কাঠামো চালু রয়েছে, সেটি হঠাৎ করে ব্যাপক শুল্কের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হলে উভয় দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কানাডা চায়, বিদ্যমান শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে ছাড় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন করে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ বন্ধ করা হোক। ফলে আলোচনায় একদিকে যেমন মার্কিন দাবিগুলো বিবেচনায় নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে কানাডার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করতে হচ্ছে।

আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে অ্যালকোহল পণ্যের বাজার। কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন অ্যালকোহল পণ্যের বিক্রি ও বিতরণ নিয়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করে, এসব নিয়ম মার্কিন উৎপাদকদের জন্য বৈষম্যমূলক। তাই কানাডার প্রাদেশিক পর্যায়ের কিছু বিধিনিষেধ প্রত্যাহার বা শিথিল করার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

সমস্যা হলো, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই সব ধরনের প্রাদেশিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ একতরফাভাবে তুলে দিতে পারে না। প্রাদেশিক সরকারগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে এবং অ্যালকোহল বিক্রির নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে ফেডারেল সরকারকে একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষি এবং নিজেদের প্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। সময়সীমা যখন দ্রুত শেষ হয়ে আসছে, তখন এই অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ও অটোয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কানাডার গাড়ি শিল্পও নতুন শুল্কের আশঙ্কায় রয়েছে। দেশটির গাড়ি উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। একটি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও সংযোজনের প্রক্রিয়ায় একাধিকবার সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়। ফলে কোনো একটি পর্যায়ে বড় শুল্ক বসলে তার প্রভাব পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মার্কিন প্রশাসন কানাডার অটোমোবাইল নীতির সমালোচনা করে আসছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, কানাডার কিছু নীতি মার্কিন গাড়ি নির্মাতা ও শ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করছে না। কানাডা অবশ্য এই খাতে নিজেদের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই পক্ষের এই অবস্থানের কারণে গাড়ি শিল্প নিয়ে আলোচনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারও বহুদিনের বিরোধের একটি ক্ষেত্র। কানাডার সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা দেশটির কৃষকদের সুরক্ষা দিতে উৎপাদন ও আমদানির ওপর নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ রাখে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে এবং কানাডার বাজারে মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে।

কানাডার কৃষি খাতের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ দেশটির দুগ্ধ খাতের সঙ্গে হাজার হাজার কৃষক, খামার এবং স্থানীয় ব্যবসা জড়িত। বাজারে হঠাৎ বড় পরিবর্তন হলে একদিকে যেমন কৃষকদের আয় ও উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে। ফলে এই খাতেও সমঝোতার পথ খুঁজছে অটোয়া।

তবে সম্ভাব্য শুল্কের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বিপুলসংখ্যক পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়লে উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত ব্যয় নিজেদের মধ্যে বহন করবেন, নাকি পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন—সেটিও বড় প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব দুই দেশের বাজারেই পড়তে পারে।

কানাডার অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দীর্ঘদিনের সীমান্তবাণিজ্যের কারণে দুই দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কানাডাকে বিকল্প বাজার খুঁজতে হতে পারে এবং নিজেদের সরবরাহব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে। কিন্তু রাতারাতি এত বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও ভোক্তারাও কানাডার ওপর নির্ভরশীল। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, শিল্প উপকরণ ও কৃষিপণ্য যায়। ফলে কানাডীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে মার্কিন আমদানিকারকদের খরচও বাড়তে পারে। এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই প্রস্তাবিত শুল্ক শুধু কানাডার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ কারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনার দরজা খোলা রাখার চেষ্টা করছে কানাডা। অটোয়ার লক্ষ্য এখন এমন একটি সমঝোতা তৈরি করা, যাতে ওয়াশিংটনের কিছু উদ্বেগের সমাধান করা যায় এবং একই সঙ্গে কানাডার শিল্প ও কৃষিখাতকে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। তবে সময় খুবই কম। বুধবার শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে কোনো চুক্তি না হলে কানাডীয় ব্যবসায়ীদের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের শিল্প, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা—দুই দিক সামলাতে হচ্ছে সরকারকে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে কানাডার অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে, আবার অতিরিক্ত ছাড় দিলে দেশের অভ্যন্তরে সরকারের সমালোচনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আলোচনার ফল কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বুধবারের সময়সীমার আগে চুক্তি হলে কানাডা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ এড়ানোর সুযোগ পাবে। আর সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের অর্থনীতির জন্য নয়, উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শেষ মুহূর্তের এই দর-কষাকষির ফল শুধু অটোয়া বা ওয়াশিংটনের জন্য নয়, দুই দেশের ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সবার নজর বুধবারের আগে দুই সরকার একটি সমঝোতার পথে পৌঁছাতে পারে কি না, সেদিকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত