প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে জুনে যে সমঝোতার মাধ্যমে সাময়িকভাবে যুদ্ধের তীব্রতা কমেছিল, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তেহরান নিজেদের সামরিক অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এত দিন যে সামরিক প্রতিক্রিয়াকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, প্রয়োজনে সেটিই আরও আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি শত্রুপক্ষকে ‘কৌশলগত চমক’-এর জন্য প্রস্তুত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও নিজেদের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো চাপ বা নির্দিষ্ট সময়সীমার ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত নেবে না। ফলে সমুদ্রপথটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এখন দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ইরানের বর্তমান সামরিক অবস্থান বুঝতে হলে দেশটির সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতির দিকে নজর দিতে হয়। তেহরানের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ইরান কোনো বিদেশি বাহিনীকে নিজেদের ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে প্রবেশের সুযোগ না দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকাগুলোকে সম্ভাব্য সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশের অঞ্চল এবং তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রস্তুতি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
ইরানের সামরিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে সরাসরি বড় আকারের প্রচলিত স্থলযুদ্ধে না গিয়ে বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। দেশটির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ইরানের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, পাহাড়ি অঞ্চল, দীর্ঘ উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলো কোনো বিদেশি বাহিনীর জন্য দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে। ইরানি কর্মকর্তারাও যুক্তি দিচ্ছেন, হরমুজ অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে নিতে স্থল অভিযান পরিচালনা করতে হলে বিপুলসংখ্যক সেনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। এই মূল্যায়ন থেকেই বোঝা যায়, তেহরান সম্ভাব্য যুদ্ধকে দ্রুত নিষ্পত্তির বদলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছে।
ইরানের আরেকটি সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে সমুদ্রপথকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যে প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জুনের সমঝোতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে আবার স্বাভাবিক করা, কিন্তু সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এ বিষয়ে স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থল অভিযান হলে ইরান সরাসরি মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। ইরানের কট্টরপন্থী মহল এরই মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে এটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বিমান ও নৌ সক্ষমতা রয়েছে এবং সেসব স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা সংঘাতকে দ্রুত আরও বিস্তৃত করে দিতে পারে।
ইরানের সামরিক কৌশলের আরেকটি স্তর হতে পারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ব্যবহার। সাম্প্রতিক সংঘাতে দেশটি দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ভবিষ্যতে সরাসরি স্থল অভিযান শুরু হলে ইরান হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রকে শুধু নিজের সীমান্তে আটকে না রেখে আঞ্চলিক সামরিক লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত বিস্তৃত করার চেষ্টা করবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মূল স্থল অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যের সবকিছুকে বাস্তব যুদ্ধপরিকল্পনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। যুদ্ধের আগে রাজনৈতিক বার্তা, ভয় দেখানো এবং প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা সামরিক কৌশলেরই অংশ। ‘কৌশলগত চমক’ বা আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার ঘোষণা এমন একটি বার্তাও হতে পারে, যার উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের খরচ ও ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা। একইভাবে তেহরান হয়তো আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেও সামরিক সক্ষমতার কথা সামনে আনছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনও এই নতুন অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সাম্প্রতিক সময়ে আইআরজিসি ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিজ্ঞ ও কট্টরপন্থী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। আহমাদ ওয়াহিদির নেতৃত্বে আইআরজিসির সামরিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তেহরানের বর্তমান নেতৃত্ব প্রতিরোধের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তুতির কথা জানায়নি। ফলে ইরানের বর্তমান যুদ্ধপ্রস্তুতি মূলত সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। আকাশ ও সমুদ্র থেকে হামলার তুলনায় স্থল অভিযান অনেক বেশি ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইরানের বিশাল ভূখণ্ড ও পাহাড়ি অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক ও লজিস্টিক—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের জন্যও এমন সংঘাত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, কমান্ড সেন্টার, বিমানঘাঁটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধ দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও ভয়াবহ চাপ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যাপক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শিশু ও পরিবারসহ বেসামরিক মানুষের ওপর যুদ্ধের মানবিক মূল্যও ক্রমেই বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় ইরানের সম্ভাব্য কৌশলকে একক কোনো সামরিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সরাসরি স্থল প্রতিরোধ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চল রক্ষা, হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা—এসবকে সমন্বিত প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে ইরানে স্থল অভিযান কোনো স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযান হবে না।
তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকবে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইরান বলছে, চাপ ও হুমকির ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রও আগের সমঝোতা বাড়ানোর বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা, পারমাণবিক ইস্যু এবং দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস একই সঙ্গে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখানেই—ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থানের ঘোষণা কি কেবল প্রতিরোধমূলক বার্তা, নাকি সত্যিই যুদ্ধের নতুন পর্যায়ের প্রস্তুতি। আপাতত নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো তথ্য নেই যে যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। কিন্তু তেহরানের সাম্প্রতিক সামরিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরান আগের মতো শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল করে তোলার চেষ্টা করতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাই হরমুজ থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।