নিরাপদ মাছ উৎপাদনে জোর, রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
নিরাপদ মাছ উৎপাদনে জোর, রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে খাদ্যের সংকটের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দেশের মৎস্য খাতকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও মাননির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত মৎস্যপণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানি সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) আয়োজনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্যসম্পদ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের মৎস্য খাতের বর্তমান সমস্যা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, মানুষের খাদ্যচাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত মাছের চাহিদা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা গেলে এ খাতের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করে মৎস্যপণ্য বাজারজাত করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা জরুরি। মাছের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ওপর বাড়তে থাকা চাপ কমানোও জরুরি।

কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত চাপ মাছের স্বাভাবিক উৎপাদন ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশসম্মত ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। সীমিত জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে অধিক মাছ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশের মিঠাপানির মাছের চাহিদা রয়েছে। এই বাজারকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। তবে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের পছন্দের মাছ উৎপাদন করলেই চলবে না। যে দেশে পণ্য রপ্তানি করা হবে, সেই দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পছন্দ ও বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে হবে।

তিনি চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর রপ্তানি সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত পোনা উৎপাদন ও প্রজননব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লালন-পালন করা গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

মৎস্য খাতের উন্নয়নে নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো গেলে মৎস্য খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সহজ হবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের বেড়ে ওঠা ও প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নদী-নালা দখল, নাব্যতা সংকট এবং শিল্পকারখানার বর্জ্যের কারণে পানিদূষণ মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্রকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে নদী ও খালের নাব্যতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মৎস্যচাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে একদিকে মাছচাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে জেলা পর্যায়ে সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় মাছের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্য খাত গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের পুষ্টির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি মাছের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা অন্যতম বড় শর্ত। উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি, খাদ্য, ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদক থেকে রপ্তানিকারক পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

সেমিনারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান।

মৎস্য খাতের সামনে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, জলজ পরিবেশ রক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পণ্য ও উৎপাদন কৌশল গ্রহণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে গবেষণা ও বাস্তবভিত্তিক নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের মৎস্য খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের পথও আরও প্রশস্ত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত