নোয়াখালীতে তিন শিক্ষার্থী হত্যা: তিনজনের ফাঁসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার
নোয়াখালীতে তিন শিক্ষার্থী হত্যা: তিনজনের ফাঁসি

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীতে তিন কলেজশিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যার প্রায় এক দশক পর আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় দুই আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।

রোববার দুপুর ১২টার দিকে নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিশেষ জজ মো. শওকত আলী এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফিরোজ মাহমুদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনসহ বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি তাফাক্কর হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন বেগমগঞ্জ উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের কুদরত উল্যাহর ছেলে ওমর নাসির সাজু, ওমর শরীফ সুলতান এবং নোয়াখালী পৌরসভার শান নগর এলাকার তোফায়েল আহম্মেদের ছেলে মো. সৌরভ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন বেগমগঞ্জের ফিরোজ মাহমুদ, কুদরত উল্যাহ ও হারুনুর রশীদ বাবুল। খালাস পাওয়া দুই আসামি হলেন অনন্তপুর গ্রামের ফয়সাল মাহমুদ ও মো. মামুন।

আদালতের এই রায় এসেছে ২০১৬ সালের মার্চে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে। একসঙ্গে তিন তরুণ শিক্ষার্থীর প্রাণহানির সেই ঘটনা নোয়াখালীর মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্ক তৈরি করেছিল। একটি পুকুরে কুকুর গোসল করানোকে কেন্দ্র করে বিরোধের পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার দিন ছিল ২০১৬ সালের ২১ মার্চ। দুপুরে নোয়াখালী সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শাখার পুরোনো ক্যাম্পাসের পাশে একটি পুকুরে কুকুর গোসল করানোকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে আগে থেকেই থাকা উত্তেজনার সঙ্গে এই বিরোধ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাতে অনন্তপুর এলাকায় তিন শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

মামলার নথি ও অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন রাত ৯টার দিকে অনন্তপুর গ্রামের হাজী কুদরত উল্যাহর ছেলে সাজু ও সৌরভসহ কয়েকজন যুবক তিন শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে পিস্তল দিয়ে গুলি চালান। এতে নোয়াখালী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম ওয়াসিম বুকের ডান পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর দুই বন্ধু ফজলে রাব্বী রাজিব ও জামসেদুল হক ইয়াছিনও গুলিবিদ্ধ হন।

রাজিব ও ইয়াছিন দুজনেরই পেটে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনেরই মৃত্যু হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন তরুণ শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে তাঁদের পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। একটি স্বাভাবিক সন্ধ্যা তিন পরিবারের জন্য পরিণত হয় জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ে।

নিহত তিন শিক্ষার্থীই ছিলেন স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় ভরা তরুণ। পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। কিন্তু একটি স্থানীয় বিরোধ ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব তাঁদের জীবন কেড়ে নেয়। দীর্ঘ সময় পর আদালতের রায়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিচার পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করলেন।

ঘটনার পরদিন, ২২ মার্চ রাতে নিহত রাজিবের মা কামরুন নাহার ছবি বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় সাজুকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি মামলার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে, যা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরে। আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের খালাস দিয়েছেন।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে মামলাটি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নিহতদের পরিবার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। একদিকে স্বজন হারানোর দীর্ঘ বেদনা, অন্যদিকে মামলার রায় পাওয়ার অপেক্ষা—প্রায় এক দশক ধরে পরিবারগুলোর জন্য এই সময় ছিল কঠিন পরীক্ষার।

তিন শিক্ষার্থীকে হারানোর পর তাঁদের পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা পূরণ হয়নি। পরিবারের সদস্যদের কাছে আদালতের রায় তাই শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার পর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া একটি আলাদা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়, রায়ের মাধ্যমে বিচারিক পর্যায়ে মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি এসেছে।

নোয়াখালী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্যের সংঘাত এবং আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার নিয়ে সেই সময়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। শিক্ষাঙ্গনের আশপাশে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন ও পড়াশোনা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, ঘটনাটি তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ হয়ে আছে।

এই মামলার রায় স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও একটি বার্তা বহন করছে। আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা শেষ পর্যন্ত কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তিন শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড তার নির্মম দৃষ্টান্ত। একটি ছোট বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নেয়, তা এই ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় ধরে চললে ভুক্তভোগী পরিবারকে শুধু আইনি লড়াই নয়, মানসিক ও সামাজিক চাপও মোকাবিলা করতে হয়। সাক্ষ্য, তদন্ত, আসামিদের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি এবং আদালতের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছাতে সময় লাগে। এই মামলাতেও দীর্ঘ সময় পর রায় ঘোষিত হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে রায় ঘোষণার পরও মামলার আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিলসহ প্রচলিত আইনগত সুযোগ রয়েছে। ফলে আদালতের আজকের রায় বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ওপরও মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে।

নোয়াখালীর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, তাঁদের প্রিয়জনদের হত্যার বিচার হবে কি না। প্রায় দশ বছর পর ঘোষিত রায় সেই অপেক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। তিন তরুণের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, তাঁদের পরিবারে ফিরে আসবে না হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক দিনগুলোও। তবে আদালতের রায় তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে অন্তত একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

এই ঘটনা একই সঙ্গে সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। স্থানীয় বিরোধ, আধিপত্যের লড়াই কিংবা সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের ব্যবহার যে মুহূর্তের মধ্যে একাধিক পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, নোয়াখালীর তিন শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড তার নির্মম প্রমাণ। সহিংসতার বদলে আইনের পথে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে এমন трагедия আবারও ঘটতে পারে।

আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বহুল আলোচিত হত্যামামলার বিচারিক অধ্যায় নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন নিহত সাইফুল ইসলাম ওয়াসিম, ফজলে রাব্বী রাজিব ও জামসেদুল হক ইয়াছিনের পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোও যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে এবং আদালতের রায়ের বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথ সম্পূর্ণ হবে। তিন তরুণের অপূর্ণ স্বপ্ন ও তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার স্মৃতি নোয়াখালীর মানুষের কাছে এই মামলাকে বহুদিন গুরুত্বপূর্ণ করে রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত