প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলা কবিতার আধুনিকতার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর কবি শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। দুই দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলা কবিতা, বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা এবং স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতি আজও গভীর ও অনিবার্য।
শামসুর রাহমান ছিলেন এমন এক কবি, যাঁর সাহিত্যকর্মকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা সৌন্দর্যচেতনার পরিসরে আবদ্ধ করা যায় না। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে একটি জাতির রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং স্বাধীন দেশের মানুষের হতাশা-প্রত্যাশা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে বাঙালির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর এক ধরনের সাহিত্যিক দলিল।
১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। শৈশব ও কৈশোরের ঢাকা তাঁর সাহিত্যিক মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণ করেন। পঞ্চাশের দশকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার যে নতুন প্রবাহ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, শামসুর রাহমান সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্য পাঠকের নজর কাড়ে। এরপর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি অসংখ্য কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বিস্তৃত। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
তবে শামসুর রাহমানকে সাধারণ পাঠকের কাছে সবচেয়ে গভীরভাবে পরিচিত করেছে তাঁর সময়সচেতন কবিতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কবিতায় নানা মাত্রায় উঠে এসেছে।
তাঁর ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্টকে কেন্দ্র করে লেখা এই কবিতা বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি তরুণের আত্মত্যাগ কীভাবে একটি জাতির প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়, শামসুর রাহমান সেই অনুভূতিকে কবিতার ভাষায় অসাধারণ শক্তিতে প্রকাশ করেছেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, মৃত্যু, অনিশ্চয়তা এবং স্বাধীনতার প্রত্যাশার মধ্যে তিনি মানুষের স্বপ্নকে ধারণ করেছিলেন। সেই সময়ের কবিতাগুলো পরবর্তীকালে ‘বন্দী শিবির থেকে’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা কাব্যসাহিত্যে এই গ্রন্থের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’র মতো কবিতায় স্বাধীনতার প্রতি বাঙালির আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগ এক অনন্য কাব্যিক রূপ পেয়েছে। এসব কবিতার ভাষা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক। সেখানে একজন মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে যায় একটি জাতির স্বপ্ন। এ কারণেই তাঁর অনেক কবিতা প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের কাছে নতুন করে অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বাধীনতা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় অর্জন নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও মুক্তির প্রতীক। তাঁর কবিতায় অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা স্বৈরাচারী শাসনের সময়েও তিনি কবিতাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তাঁর কলম নীরব থাকেনি। রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যায়, মানুষের অধিকার হরণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংকট তাঁর কবিতায় প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে। তবে তাঁর প্রতিবাদ কখনো কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ হয়নি। মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতি ও নগরজীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁর কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বহুমাত্রিকতাই শামসুর রাহমানকে বাংলা কবিতায় আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। একদিকে তিনি ছিলেন সময় ও রাজনীতির কবি, অন্যদিকে মানুষের একান্ত অনুভূতিরও কবি। তাঁর কবিতায় ঢাকা শহরের ব্যস্ততা, নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও বিচ্ছেদ যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে যুদ্ধ, স্বাধীনতা, মৃত্যু এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তাপ।
সাংবাদিক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদপত্রের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ দেয়। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্মে সময়ের পরিবর্তন, মানুষের জীবন এবং রাষ্ট্রের নানা সংকটের প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হন। দেশ-বিদেশে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বাংলা ভাষার আধুনিক কবিতায় তাঁর অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
তবে শামসুর রাহমানের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পুরস্কার বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো পাঠকের মনে স্থায়ী হয়ে থাকা কবিতা। তাঁর কবিতার বহু পঙ্ক্তি মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং স্বাধীনতার বিভিন্ন স্মরণীয় মুহূর্তে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে।
মৃত্যুর দুই দশক পরও তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে কেন এত প্রাসঙ্গিক—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। যে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবন তিনি তাঁর কবিতায় ধারণ করেছিলেন, তার অনেক প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের অধিকার নিয়ে যে আলোচনা তাঁর সময়ে ছিল, তার অনেকটাই আজও সমকালীন।
তাঁর কবিতার শক্তি এখানেই—সময় বদলালেও তার মানবিক আবেদন মুছে যায় না। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মুহূর্তকে কেন্দ্র করে লেখা কবিতাও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে। কারণ তাঁর কবিতার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। আর মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্বপ্ন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
শামসুর রাহমানের মৃত্যু বাংলা সাহিত্যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছিল। কিন্তু তাঁর সাহিত্য সেই শূন্যতাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি। তাঁর বই, কবিতা ও চিন্তা নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছেছে; সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ফিরে এলে নতুন করে স্মরণ করা হয় তাঁর কবিতার শক্তি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির গভীর সম্পর্ক।
আজ তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রয়াত কবির জীবন ও কর্মের কথা বলা নয়। বরং তাঁর কবিতায় যে মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতার চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কবির জীবন শেষ হয়েছে দুই দশক আগে, কিন্তু তাঁর শব্দ এখনো জীবন্ত।
বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে শায়িত আছেন শামসুর রাহমান। সময়ের হিসাবে তাঁর চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে ২০ বছর। কিন্তু বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে তাঁর উপস্থিতি এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস যত নতুনভাবে পাঠ করা হচ্ছে, তাঁর কবিতাও তত নতুন অর্থে ফিরে আসছে।
শামসুর রাহমান তাই শুধু একটি নাম নন; তিনি বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার এক দীর্ঘ অধ্যায়, এক উত্তাল সময়ের সাক্ষী এবং স্বাধীনতা ও মানবিক মুক্তির এক শক্তিশালী কণ্ঠ। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী আজ সেই কণ্ঠকে আবারও মনে করার দিন—যে কণ্ঠ কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে এবং বাংলা ভাষাকে দিয়েছে আধুনিকতার এক অনন্য কাব্যিক শক্তি।