চট্টগ্রামে শনাক্তের আগেই হাম ওয়ার্ডে শিশুরা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৯ বার
চট্টগ্রামে শনাক্তের আগেই হাম ওয়ার্ডে শিশুরা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামে হামের প্রকোপের মধ্যে রোগ শনাক্তের আগেই অনেক শিশুকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে। এতে একদিকে রোগীদের সঠিক চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদেরও বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে হাম না থাকা শিশুরাও আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে হাম শনাক্তের পরীক্ষা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

১২ বছরের বর্ণ চৌধুরীর অভিজ্ঞতা এই সমস্যার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। হঠাৎ জ্বর দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর অসুস্থতা। একপর্যায়ে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। দুই দিনের মাথায় পিঠ ও দুই রানের ভাঁজে দেখা দেয় ফুসকুড়ি। পরদিন সেই ফুসকুড়ি শরীরের আরও কয়েকটি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েক ধরনের ওষুধ সেবনের পর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান।

সেখানে চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে হামের আশঙ্কা করেন এবং বর্ণকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু দুই দিন পর আরেক চিকিৎসক শিশুটিকে দেখে প্রশ্ন তোলেন, কেন তাকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর শরীরে দেখা দেওয়া ফুসকুড়ি হামের উপসর্গ নয় বলেও তিনি মত দেন। পরে হাম ওয়ার্ডের চিকিৎসকেরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে সেদিন বিকেলেই বর্ণকে কেবিনে স্থানান্তর করেন। নমুনা পরীক্ষার পর তিন দিন পরে জানা যায়, বর্ণের হাম হয়নি।

কিন্তু ততক্ষণে কয়েক দিন তাকে হাম আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে থাকতে হয়েছে। ফলে হাম না থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নতুন করে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্ণের পরিবারের দুশ্চিন্তার জায়গাটি এখানেই। যে শিশুকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা হয়েছিল, রোগ শনাক্তের অনিশ্চয়তার কারণে তাকেই শেষ পর্যন্ত অন্য একটি সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

বর্ণের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন আরও অনেক শিশুর স্বজন। চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। ফলে নমুনা সংগ্রহের পর রিপোর্ট হাতে পেতে কয়েক দিন সময় লেগে যাচ্ছে। এই সময়টুকুতে চিকিৎসকদের অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। হামের উপসর্গ থাকা মানেই যে রোগী নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত—তা নয়। কিন্তু পরীক্ষার ফল হাতে না থাকায় অনেক শিশুকে সতর্কতার অংশ হিসেবে হাম ওয়ার্ডে রাখতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৯০০ শিশু। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৬ জন। প্রতিদিন গড়ে নতুন করে অর্ধশতাধিক শিশু ভর্তি হচ্ছে। ৮ আগস্ট একদিনে ৭৭ জন এবং ১৩ আগস্ট ৭৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ১৪৫ জনে। বিপুলসংখ্যক রোগীর এই চাপ হাসপাতালগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে।

চিকিৎসকদের মতে, হামের ভাইরাস নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ভাইরোলজি বা মলিকুলার ডায়াগনস্টিক সক্ষমতাসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার সুযোগ থাকতে হয়। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস বা বিআইটিআইডিতে এ ধরনের পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরও সেখানে নিয়মিত পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি।

ফলে চট্টগ্রাম থেকে নমুনা পাঠানো হচ্ছে ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে। নমুনা সংগ্রহ, পরিবহন, পরীক্ষা এবং রিপোর্ট ফেরত আসার পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে। রোগীর সংখ্যা যখন প্রতিদিন বাড়ছে, তখন এই বিলম্ব চিকিৎসকদের জন্যও একটি বড় বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, রোগীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি এবং স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা চালুর প্রয়োজনীয়তা ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে। তাঁর মতে, বিআইটিআইডিতে ল্যাবরেটরি, জনবলসহ পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে হাম পরীক্ষা চালুর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমতিসহ নির্দিষ্ট কিছু গাইডলাইন অনুসরণ করার বিষয়ও রয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, হাম ও হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভুল চিকিৎসার শিকার যাতে কেউ না হন, সে বিষয়েও চিকিৎসকদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসা বলেন, প্রতিদিন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়ছে এবং বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রতিটি শিশুর শরীরে উপসর্গ একই রকম নাও হতে পারে। শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলেই সেটিকে হাম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আরও গবেষণা ও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায়ও দেখা যাচ্ছে, হামের মতো উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া অনেক শিশুর পরবর্তী পরীক্ষায় হাম ধরা পড়ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকেও হামের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফলে শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

এই বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা চালুর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ রোগীকে দ্রুত আলাদা করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য রোগ নির্ণয়ের সময় কমিয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে একটি সংক্রামক রোগের ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাখা নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বর্ণ চৌধুরীর মা লিপি চৌধুরীর উদ্বেগ তাই শুধু নিজের সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে নয়। তাঁর প্রশ্ন, হাম না থাকা সত্ত্বেও যদি হাসপাতালে থাকার কারণে তাঁর সন্তান নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়, তাহলে সেই দায়ভার কে নেবে? একজন মায়ের এই প্রশ্নের মধ্যে চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির একটি মানবিক চিত্র ফুটে ওঠে।

সাড়ে চার বছর বয়সী মায়মুনের পরিবারও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। মায়মুনের বাবা মো. সোয়েব জানান, নমুনা নেওয়ার তিন দিন পরও রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। অথচ তাঁর সন্তানকে হাম ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চারপাশে হাম শনাক্ত হওয়া শিশু থাকায় পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কয়েক দিন পর চিকিৎসকেরা জানান, মায়মুনের হাম হয়নি এবং তাঁকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা পরিবারগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি মানসিকভাবেও কঠিন। একদিকে সন্তান জ্বরে কাতর, অন্যদিকে রোগটি আসলে কী তা নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা। তার ওপর পাশে থাকা অন্য কোনো রোগীর কাছ থেকে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনদের উদ্বেগও বাড়ছে।

চট্টগ্রামে হামের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রশ্ন নয়; রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের সক্ষমতা, পৃথক ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সমন্বিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা রাখা, দ্রুত নমুনা পরীক্ষা এবং নিশ্চিত রোগীর জন্য যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এর পাশাপাশি শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় টিকা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে দ্রুত সচেতনতা বাড়ানো এবং বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন যে সংখ্যক শিশু হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে আসছে, তাতে দ্রুত রোগ শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একটি শিশুর ক্ষেত্রে কয়েক দিনের রিপোর্ট বিলম্ব হয়তো প্রশাসনিক দৃষ্টিতে একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়, কিন্তু পরিবারের কাছে সেই কয়েকটি দিন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং নতুন সংক্রমণের আশঙ্কায় ভরা।

বর্ণ, মায়মুনসহ এমন শিশুদের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাম নেই এমন শিশুকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাম ওয়ার্ডে রাখার ঝুঁকি কমাতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পৃথকীকরণ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, সমন্বিত উদ্যোগ এবং রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ানো। কারণ একটি শিশুকে সুস্থ করতে গিয়ে যেন তাকে অন্য একটি সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি মানবিক ও জনস্বাস্থ্যগত প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com