প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে নানা উদ্যোগ। ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি চিকিৎসার মতো নানা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু এসব উদ্যোগ ও সনদ পাওয়ার পরও শিল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের মৃত্যুঝুঁকি পুরোপুরি কমছে না। বরং একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা প্রশ্ন তুলছে গ্রিন সনদের কার্যকারিতা এবং সনদ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি নিয়ে।
সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে চলতি বছর এ পর্যন্ত ১২ শ্রমিকের প্রাণহানির তথ্য সামনে এসেছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৪৯টি দুর্ঘটনায় চার শ্রমিক নিহত এবং ৬২ জন আহত হন। আর ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে এ শিল্পে ১২৯ শ্রমিক নিহত ও ২০৫ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)। দীর্ঘ সময়ের এই পরিসংখ্যান বলছে, জাহাজভাঙা শিল্পকে নিরাপদ করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব কর্মপরিবেশে ঝুঁকি এখনও বড় হয়ে আছে।
জাহাজভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগে একটি পুরোনো জাহাজ নিরাপদ কি না, সেটি যাচাইয়ের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে ব্যবস্থা রয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাহাজ পরিদর্শন করে। জাহাজে বিস্ফোরক বা বিষাক্ত কোনো পদার্থ রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের পর বিস্ফোরক অধিদপ্তর ‘গ্যাস ফ্রি সনদ’ দেয়। পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশগত বিষয়গুলো দেখে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ঝুঁকি তদারকির দায়িত্ব রয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থারও নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।
এতগুলো সংস্থার সমন্বিত তদারকির পরও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় মূল প্রশ্নটি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সনদ পাওয়ার পর ইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ কতটা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ একটি ইয়ার্ডকে গ্রিন ঘোষণা করাই নিরাপত্তার শেষ ধাপ নয়; বরং সনদ পাওয়ার পর প্রতিদিনের কার্যক্রমে নির্ধারিত মানদণ্ড বজায় রাখাই এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশনের নীতিমালা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন ২০০৯ সালের মে মাসে এই কনভেনশন গ্রহণ করে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর গত বছরের ২৬ জুন এটি কার্যকর হয়। এর পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২৩টি ইয়ার্ড গ্রিন সনদ পেয়েছে এবং আরও ছয়টি ইয়ার্ডের সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
গ্রিন ইয়ার্ডের ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশ রক্ষা এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এ জন্য ইয়ার্ডে বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়। জাহাজ থেকে বের হওয়া তেল, রাসায়নিক বা অন্যান্য ক্ষতিকর তরল যাতে সরাসরি মাটিতে কিংবা পানিতে মিশে যেতে না পারে, সে জন্য নির্দিষ্ট মেঝে ও পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হয়। বিপজ্জনক বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও এর অংশ।
এসব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইয়ার্ড মালিকদের বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের পেছনে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের পরও যদি কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত নিরাপত্তা অনুশীলন না থাকে, শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না দেওয়া হয় কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে কাগজে থাকা সনদ শ্রমিকের জীবন রক্ষা করতে পারে না।
সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোর সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার তথ্যও সেই উদ্বেগকে সামনে আনছে। গ্রিন সনদ পাওয়া ফেরদৌস স্টিলে চারটি দুর্ঘটনায় নয়জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। কেআর স্টিল ইয়ার্ডে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৯ শ্রমিক আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আরেফিন এন্টারপ্রাইজে নয়টি এবং জনতা স্টিলে ছয়টি দুর্ঘটনার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ দেওয়ার পর তদারকির ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জাহাজভাঙা শিল্পে একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন শ্রমিকের কর্মজীবন থামিয়ে দেয় না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। কর্মক্ষম একজন মানুষ মারা গেলে পরিবারটি অনেক সময় হঠাৎ করে আয়হীন হয়ে পড়ে। আহত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা এবং কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে পরিবারের ওপর চাপ তৈরি হয়। ফলে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু শিল্পের উৎপাদনশীলতা কিংবা আন্তর্জাতিক সনদের বিষয় নয়, এটি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শ্রমিক নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা ইপসার অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন মনে করেন, হংকং কনভেনশনের মান বাস্তবায়নের পাশাপাশি শ্রমিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা মহড়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সনদ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সনদ পাওয়ার পর প্রতিদিনের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মাহবুব হোসেন জানিয়েছেন, গ্রিন সনদ পাওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে তিনটি ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সনদ পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড সব ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিপুল পরিমাণ ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতব সামগ্রী পুনঃব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয় এই শিল্পের মাধ্যমে। একই সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। তাই শিল্পটি বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়; বরং শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে এটিকে টেকসই শিল্পে পরিণত করাই প্রয়োজন।
এর জন্য সনদ দেওয়ার আগে যেমন কঠোর যাচাই প্রয়োজন, তেমনি সনদ পাওয়ার পরও নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। কোনো ইয়ার্ডে নিরাপত্তা মান লঙ্ঘিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারে বাধ্য করা এবং দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে পুনরাবৃত্তি ঠেকানো জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে গ্রিন সনদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে যদি মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে, তাহলে সেই সনদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক মানের কাগজপত্র ও অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সংস্কৃতি তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
শ্রমিকের জীবন কোনো শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ের অংশ হতে পারে না। একটি জাহাজ ভাঙার কাজ শেষ করে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করার আগে নিশ্চিত করতে হবে, সেই কাজটি করতে গিয়ে কোনো পরিবার যেন তার প্রিয় মানুষকে না হারায়। সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে গ্রিন সনদের প্রকৃত সাফল্য তাই নতুন ইয়ার্ডের সংখ্যা দিয়ে নয়, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কতটা কমছে—তার ওপরই নির্ভর করবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, সনদ যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে; তার প্রতিটি শর্ত যেন বাস্তবে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তায় পরিণত হয়।