প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাত্র ৩৮ দশমিক ৫ মিনিটের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিপরীত উপকূল থেকে দুটি ফ্যালকন ৯ রকেট উৎক্ষেপণ করে নতুন রেকর্ড গড়েছে মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। একই দিনে পরপর দুটি কক্ষপথ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত উৎক্ষেপণ সক্ষমতা, রকেট পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং মহাকাশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
শনিবার স্থানীয় সময় রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে এই দুটি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করা হয়। প্রথম উৎক্ষেপণটি হয় ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে। এর মাত্র ৩৮ দশমিক ৫ মিনিট পর ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেস থেকে দ্বিতীয় ফ্যালকন ৯ রকেটটি মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি পৃথক উপকূল থেকে দুটি কক্ষপথ অভিযান পরিচালনা স্পেসএক্সের জন্য নতুন কোম্পানি রেকর্ড।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে স্পেসএক্স প্রায় ৬৫ মিনিটের ব্যবধানে দুটি রকেট উৎক্ষেপণ করেছিল। এবার সেই রেকর্ডের তুলনায় সময়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে একই দিনে একাধিক উৎক্ষেপণ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের সক্ষমতা আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলে মনে করছেন মহাকাশ খাতের পর্যবেক্ষকেরা।
প্রথম ফ্যালকন ৯ রকেটটি ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে রাত ৯টা ১২ মিনিটে উৎক্ষেপণ করা হয়। রকেটটির বহন করা পেলোডের মধ্যে ছিল স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্লোবালস্টারের জন্য আটটি নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথ বা লো আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট। উৎক্ষেপণের প্রায় ৫৬ মিনিট পর স্যাটেলাইটগুলো নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে আটটি স্যাটেলাইটই সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়।
নতুন স্যাটেলাইটগুলো গ্লোবালস্টারের বিদ্যমান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইসে সরাসরি যোগাযোগসেবা উন্নত করার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় সংযোগ সুবিধা উন্নত করাও এ ধরনের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রথম উৎক্ষেপণের পর যখন গ্লোবালস্টারের স্যাটেলাইটগুলো কক্ষপথে স্থাপনের কাজ চলছিল, তখনই ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে দ্বিতীয় ফ্যালকন ৯ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে স্পেসএক্স। রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ভ্যানডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেস থেকে দ্বিতীয় রকেটটি মহাকাশে যাত্রা করে। মাত্র ৩৮ দশমিক ৫ মিনিটের ব্যবধানের এই উৎক্ষেপণই এবারের রেকর্ডের মূল ভিত্তি।
দ্বিতীয় ফ্যালকন ৯ রকেটটিতে ছিল মার্কিন স্পেস ফোর্সের ইউএসএসএফ-৩৬৬ নামে একটি গোপনীয় পেলোড। সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হওয়ায় পেলোডটির বিস্তারিত কার্যক্রম প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই উৎক্ষেপণ স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট পরিবহনের পাশাপাশি সরকারি ও প্রতিরক্ষা খাতের মহাকাশ মিশন পরিচালনায়ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরেছে।
দুটি মিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল ফ্যালকন ৯-এর প্রথম ধাপের বুস্টার সফলভাবে পুনরুদ্ধার। উৎক্ষেপণের পর রকেটের প্রথম ধাপ আলাদা হয়ে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে। এর ফলে একই বুস্টার ভবিষ্যতে আবারও মহাকাশ অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি স্পেসএক্সের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
গ্লোবালস্টার মিশনে ব্যবহৃত বুস্টারটি ছিল বি১০৯০। এ মিশনটি ছিল ওই বুস্টারের ১৪তম মহাকাশযাত্রা। উৎক্ষেপণের প্রায় আট মিনিট পর সেটি কেপ ক্যানাভেরালের ল্যান্ডিং জোন ৪০-এ সফলভাবে অবতরণ করে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মিশনের বুস্টারটিও এর আগে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এদিন ১৮তমবারের মতো মহাকাশে যায়। মিশন শেষে সেটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থানরত স্পেসএক্সের ড্রোনশিপ ‘অফ কোর্স আই স্টিল লাভ ইউ’-তে সফলভাবে অবতরণ করে।
একটি রকেটের প্রথম ধাপ একাধিকবার ব্যবহার করতে পারা মহাকাশ উৎক্ষেপণের খরচ কমানোর পাশাপাশি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির সময়ও কমাতে সাহায্য করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতিটি উৎক্ষেপণের পর রকেটের বড় অংশই আর ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। ফলে নতুন রকেট তৈরি ও প্রস্তুত করতে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় হতো। স্পেসএক্সের পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সেই প্রচলিত ধারণায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
দুটি উৎক্ষেপণের সময়ের ব্যবধান কমে আসার পেছনেও এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের প্রস্তুতি, রকেট পরীক্ষা, পেলোড সংযোজন এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমন্বয়ও দ্রুত সম্পন্ন করতে হচ্ছে। ফলে ৩৮ দশমিক ৫ মিনিটের ব্যবধানে দুই উপকূল থেকে দুটি অভিযান পরিচালনা শুধু একটি রেকর্ড নয়, বরং পুরো উৎক্ষেপণ অবকাঠামোর সমন্বিত সক্ষমতারও পরীক্ষা।
গ্লোবালস্টারের এই মিশনটি আগে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে গিয়েছিল। স্যাটেলাইট প্রস্তুতির কারণে উৎক্ষেপণটি মে মাস থেকে পিছিয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার মিশনটি সফলভাবে পরিচালিত হয়। স্যাটেলাইটগুলো কক্ষপথে পৌঁছানোর পর প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্লোবালস্টারের প্রধান নির্বাহী পল ই. জ্যাকবসের ভাষ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটগুলো সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছানো বিশ্বজুড়ে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সময়ে স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণের বাজারেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। গ্লোবালস্টারকে কেন্দ্র করে অ্যামাজনের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার বিষয়টিও এ খাতের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করছে।
পরপর এই দুটি উৎক্ষেপণের ফলে ২০২৬ সালে স্পেসএক্সের কক্ষপথ অভিযান সংখ্যা ৯৬-এ পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। বছরের এখনো কয়েক মাস বাকি থাকতেই এত বিপুলসংখ্যক অভিযান পরিচালনা প্রতিষ্ঠানটির উৎক্ষেপণ কার্যক্রমের ব্যাপকতা তুলে ধরছে।
মহাকাশ অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, সামরিক মহাকাশ কার্যক্রম, ইন্টারনেট সেবা এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণসহ নানা ক্ষেত্রে কক্ষপথে নতুন নতুন যন্ত্র পাঠানোর প্রয়োজন বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্পেসএক্সের সাম্প্রতিক রেকর্ড সেই পরিবর্তনেরই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
মাত্র ৩৮ দশমিক ৫ মিনিটে দুই উপকূল থেকে দুটি রকেট উৎক্ষেপণের ঘটনা তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড ভাঙার ঘটনা নয়। এটি মহাকাশযাত্রাকে আরও নিয়মিত, দ্রুত এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টারও প্রতিফলন। ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণের ব্যবধান আরও কমিয়ে একই অবকাঠামো দিয়ে আরও বেশি মিশন পরিচালনা করা সম্ভব হলে বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতে তার প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে।