প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবে আবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এক সপ্তাহে ১৪ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ৬ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে পরিচালিত ধারাবাহিক যৌথ অভিযানে এসব গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে প্রায় ১৩ হাজার বিদেশিকে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত আইন প্রয়োগ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। আবাসন ও শ্রমবাজারে আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বন্ধ করা এবং অনুমোদনহীনভাবে দেশটিতে অবস্থানকারীদের শনাক্ত করাই এসব অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এক সপ্তাহের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষকে আবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এ সংখ্যা ৭ হাজার ২১৬। এছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার ৮৪৩ জন এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার ৪৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী বসবাস ও কাজ করেন। দেশটির নির্মাণ, পরিবহন, গৃহস্থালি সেবা, খুচরা ব্যবসা, খাদ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে প্রবাসী শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দেশটির নিয়মিত অভিযান প্রবাসী কর্মীদের মধ্যেও সতর্কতা তৈরি করে। বৈধ কাগজপত্র, কাজের অনুমতি এবং বসবাসের বৈধতা ঠিকঠাক না থাকলে এসব অভিযানে আটকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের সময় শুধু দেশটির অভ্যন্তরে অবস্থানরত বিদেশিদের আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি দেখা হয়নি, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ যাতায়াত ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে সৌদি আরবে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় আরও ১ হাজার ৪৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ইথিওপিয়ার নাগরিক, ৩২ শতাংশ ইয়েমেনের নাগরিক এবং বাকি ১ শতাংশ অন্যান্য দেশের নাগরিক।
এ ছাড়া সৌদি আরব থেকে অবৈধভাবে বের হওয়ার চেষ্টা করার সময় আরও ১৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকেও অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বলে বোঝা যায়।
গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বহিষ্কারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ৬ থেকে ১২ আগস্টের অভিযানের পর প্রায় ১৩ হাজার বিদেশিকে সৌদি আরব থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে বহিষ্কৃতদের জাতীয়তা বা কোন কোন অভিযোগে তাদের প্রত্যাবাসন করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসীদের জন্য দেশটির আবাসন ও শ্রম আইন মেনে চলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ অনুমতি ছাড়া কাজ করা, নির্ধারিত কর্মসংস্থানের বাইরে কাজ করা কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করা আইন লঙ্ঘনের আওতায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত আইন ভঙ্গ করলেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশকারী বা আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই নয়, তাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে কাউকে সৌদি আরবে প্রবেশে সহায়তা করা, তাদের পরিবহন বা আশ্রয় দেওয়া কিংবা এ ধরনের ব্যক্তিদের কোনো ধরনের সহায়তা বা সেবা প্রদান গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অবৈধ প্রবেশ বা অবস্থানে সহায়তা করার কাজে ব্যবহৃত যানবাহন এবং আশ্রয় দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের এই সতর্কবার্তা মূলত মানবপাচার, অবৈধ সীমান্ত পারাপার এবং অনুমোদনহীনভাবে বিদেশিদের আশ্রয় দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোর অংশ হিসেবেও এমন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
প্রবাসীদের জন্য বিষয়টি শুধু আইনগত নয়, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে কর্মরত একজন প্রবাসীর গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের ঘটনা তার নিজের কর্মজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশে থাকা পরিবারের ওপরও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। অনেক প্রবাসী নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠিয়ে পরিবারের ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটান। ফলে বৈধ কাগজপত্র ও কর্মসংস্থানের শর্ত মেনে চলা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সৌদি আরব গত কয়েক বছর ধরে শ্রমবাজার ও অভিবাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এর অংশ হিসেবে অবৈধ কর্মসংস্থান, অনুমতিহীন অবস্থান এবং সীমান্ত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে বিভিন্ন দেশের নাগরিক আটক হচ্ছেন এবং আইন অনুযায়ী অনেককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক সপ্তাহের অভিযানে ১৪ হাজার ৫৪২ জনকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ১৩ হাজার জনকে বহিষ্কারের ঘটনা সৌদি কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সীমান্তে অবৈধ প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের আটকের সংখ্যাও দেখাচ্ছে যে দেশটির নজরদারি শুধু শহর বা কর্মস্থলকেন্দ্রিক নয়, সীমান্ত এলাকাতেও বিস্তৃত।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তার পর দেশটিতে থাকা প্রবাসীদের বৈধতা ও কর্মসংস্থানের শর্ত আরও সতর্কভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিশেষ করে যাদের বসবাসের অনুমতি, কাজের অনুমতি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে জটিলতা রয়েছে, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত এসব অভিযানের ফলে দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ও আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধভাবে কাজ করা প্রবাসীদের জন্যও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তির শর্ত মেনে চলা এবং সৌদি আরবের প্রচলিত আইন সম্পর্কে সচেতন থাকার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।