ব্যাটারি রিকশায় বছরে যাচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
ব্যাটারি রিকশায় বছরে যাচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে বিদ্যুৎ সংকট যখন সাধারণ মানুষের জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে বছরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কয়েক দশ লাখে পৌঁছেছে। এসব যান স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হলেও যথাযথ নিবন্ধন, নির্ধারিত চলাচলব্যবস্থা, চার্জিং অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের নিয়ম না থাকায় খাতটি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেশে প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান চলাচলের কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি রিকশায় সাধারণত ১২ ভোল্টের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারি থাকে। দিনে কয়েক ঘণ্টা ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হয়। বিপুলসংখ্যক যান একই সময়ে চার্জে যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদায় বিশেষ করে রাতের দিকে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

এই চাপের একটি বড় অংশ আবার অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে হাজার হাজার অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ চুরির পাশাপাশি বিতরণব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টের বিস্তার দীর্ঘদিন ধরেই দৃশ্যমান। আবাসিক এলাকার গলি, দোকানের পেছনের জায়গা, ছোট গ্যারেজ কিংবা রাস্তার পাশে অস্থায়ী স্থাপনায় রাতভর ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। দিনের বেলায় যেসব রিকশা যাত্রী পরিবহন করে, সেগুলোর বড় একটি অংশ রাতে এসব স্থানে ফিরে আসে। সেখানে একসঙ্গে বহু ব্যাটারি চার্জে বসানো হলে স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

বিদ্যুৎ সংকটের সময় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকলে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে ঘাটতি সামাল দিতে হয়। এতে গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ছোট ব্যবসা, শিক্ষার্থী ও দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কোনো খাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে এককভাবে বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখার বিষয়েও সতর্কতা রয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির পেছনে জ্বালানি সরবরাহ, গ্যাসের সংকট, উৎপাদন সক্ষমতা, বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিসহ একাধিক কারণ রয়েছে। তাই এই যানবাহনের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করাও জরুরি।

অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। সহজে চালানো যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হওয়ায় দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে এই যান দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। অনেক পরিবারের প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস রিকশা চালানো। ফলে হঠাৎ করে এসব যান বন্ধ করে দিলে বিপুলসংখ্যক চালক ও তাদের পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মত হলো, নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার আওতায় আনা প্রয়োজন। কোন ধরনের রিকশা চলবে, কোথায় চলবে, কতগুলো চলবে, কীভাবে নিবন্ধিত হবে এবং কোথায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, ব্যাটারির মান এবং ব্যবহৃত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদভাবে নিষ্পত্তির বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

ব্যাটারি ব্যবহারের সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে। দেশে ব্যবহৃত অনেক ই-রিকশায় লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। পুরোনো ব্যাটারি যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার না হলে এতে থাকা ক্ষতিকর উপাদান মাটি, পানি ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার নয়, পুরো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাকেও একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

এই বাস্তবতায় সরকার ব্যাটারিচালিত ই-রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর মাধ্যমে এসব যান নিবন্ধনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিবন্ধনের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের শর্ত যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য উৎস থেকে চার্জ দিলে জরিমানার বিধান করার পাশাপাশি এমন যানবাহনের নিবন্ধন বা নবায়ন না করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহারকে ধীরে ধীরে জাতীয় গ্রিডের ওপর থেকে সরিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা গেলে একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে এবং অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ সংযোগের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে চার্জিং অবকাঠামো পর্যাপ্ত করা এবং চালকদের জন্য যুক্তিসংগত চার্জ নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা শহরের জন্য ই-রিকশাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় পৃথক জোন নির্ধারণ করা হতে পারে। জোনভেদে আলাদা রং, কিউআর কোড এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার কথাও রয়েছে। কোনো যান নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে তা শনাক্ত করার জন্য জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।

তবে কেবল পরিকল্পনা বা ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা ভাঙতে হলে নিয়মিত অভিযান, বৈধ চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সংযোগের নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রিকশা চালকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার তাই শুধু একটি পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; এটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক বিষয়। এই খাতকে একদিকে সম্পূর্ণ অবহেলা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে দেওয়াও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে।

সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা, যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাশ্রয়, অবৈধ সংযোগ বন্ধ, নিরাপদ চার্জিং ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা এবং চালকদের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে। কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয় এবং লাখো মানুষের জীবিকার এই দ্বৈত বাস্তবতার সমাধান করতে হলে কঠোরতার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিকল্পিত ও মানবিক ব্যবস্থাপনা। তাহলেই ব্যাটারিচালিত রিকশা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অনিয়ন্ত্রিত বোঝা না হয়ে একটি শৃঙ্খলিত ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত