ইউএনও অফিস বিএনপির দ্বিতীয় অফিস: সারজিস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
ইউএনও অফিস বিএনপির দ্বিতীয় অফিস: সারজিস

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কার্যালয়গুলোকে বিএনপির ‘দ্বিতীয় অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের প্রভাব বিস্তারেরও অভিযোগ করেছেন তিনি।

সোমবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সারজিস আলম এ মন্তব্য করেন। সংক্ষিপ্ত ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন উপজেলার ইউএনও কার্যালয়গুলো ক্রমেই বিএনপির দ্বিতীয় কার্যালয়ে পরিণত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা এমনভাবে ভূমিকা রাখছেন যেন তাঁরা সংশ্লিষ্ট উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও।

সারজিস আলমের এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক এবং কোথায় প্রশাসনিক স্বাধীনতার সীমা থাকা উচিত—সেই প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে।

তবে সারজিস আলম তাঁর পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো উপজেলা, ইউএনও বা বিএনপির স্থানীয় নেতার নাম উল্লেখ করেননি। তিনি কোন ঘটনার ভিত্তিতে এমন মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। ফলে তাঁর অভিযোগটি মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সামনে এসেছে। অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কোনো নেতার বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো ইউএনও কার্যালয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সমন্বয়, উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ভূমিকা এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে এই কার্যালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব সেখানে কার্যকর হলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বরাবরই আলোচনার বিষয়। নির্বাচনের সময়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি সুবিধা বণ্টন কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

সারজিস আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর অভিযোগের মূল বিষয় হলো, ইউএনও কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁরা যেন প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মতো আচরণ করছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশাসনের ওপর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে তা স্থানীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ একজন ইউএনওকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হয়। নাগরিকদের কাছে সরকারি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও এটি।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়কে পুরোপুরি অস্বাভাবিক বলার সুযোগও নেই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে উন্নয়ন ও জনসেবা সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক। তবে সেই যোগাযোগ যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলীয় প্রভাব সৃষ্টি করে, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সারজিস আলমের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগের সীমা কোথায় থাকা উচিত। বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা যদি সরকারি কার্যালয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন বা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এনসিপির এই নেতা এর আগেও প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যও একই ধরনের রাজনৈতিক উদ্বেগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সংশয় ও বিতর্ক রয়েছে, তার মধ্যেই তিনি এবার ইউএনও কার্যালয়কে ঘিরে অভিযোগ তুললেন।

সারজিস আলমের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্ভাব্য মিশে যাওয়ার আশঙ্কা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আইন ও সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। এই দুই ক্ষেত্রের সীমারেখা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

স্থানীয় পর্যায়ে এই সীমারেখা দুর্বল হলে সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন যে দলীয় পরিচয় ছাড়া প্রশাসনের কাছে সমান আচরণ পাওয়া কঠিন, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বিরোধী মতের মানুষও নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে পারেন।

তবে সারজিস আলমের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য প্রয়োজন। কোন ইউএনও কার্যালয়ে কী ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, কোন সিদ্ধান্তে তার প্রভাব পড়েছে কিংবা কোনো কর্মকর্তা কীভাবে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত অভিযোগটির ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত হতে পারে। প্রশাসন যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে, তাহলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের অবস্থানও জনসাধারণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতির মাঠে বর্তমানে দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও আলোচনা তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় ইউএনও কার্যালয়সহ মাঠ প্রশাসনের অন্যান্য দপ্তর যেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবকেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সারজিস আলমের মন্তব্য তাই কেবল একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টির প্রশাসনিক দিকটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রকৃতি কী। এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ওপর।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় কর্মকাণ্ডের প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। ইউএনও কার্যালয় যদি সত্যিই কোনো দলের ‘দ্বিতীয় অফিসে’ পরিণত হয়ে থাকে—সারজিস আলমের এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত