প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বিভাগের সাবেক সদস্য ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার নিয়োগের মধ্য দিয়ে দুদকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্যাক্স ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা কমিশনার পদে দায়িত্ব পেলেন। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময়ের রাজস্ব প্রশাসন, করনীতি, আর্থিক প্রতিবেদন ও অর্থপাচার প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন দুর্নীতি দমন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হচ্ছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন দুদক কমিশন নিয়োগের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দুদক আইন, ২০০৪-এর বিধান অনুসারে নতুন কমিশনের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশনার হিসেবে সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমপর্যায়ের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
দুদকের কমিশনার পদে ট্যাক্স ক্যাডারের একজন সাবেক কর্মকর্তার নিয়োগকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, কর ফাঁকি, অর্থপাচার এবং আর্থিক অনিয়মের অনেক ক্ষেত্রেই কর প্রশাসনের তথ্য ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় কর প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এসব বিষয়ে সাজ্জাদ হোসেনের বাস্তব অভিজ্ঞতা নতুন কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে কাজে লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ট্যাক্স ক্যাডারে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০২২ সালে অবসর নেন। পরে আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের ৪ মে তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
তার পেশাগত অভিজ্ঞতার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে কর আইন, করনীতি, ক্যাশ ফ্লো বিশ্লেষণ, আর্থিক প্রতিবেদন এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের মতো বিষয়। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ভেতরে আর্থিক অনিয়মের ধরন এবং সেগুলো শনাক্ত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সাজ্জাদ হোসেনের কর্মজীবনের শুরু সরকারি চাকরিতে নয়। ১৯৮৭ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরের বছর এবি ব্যাংক পিএলসিতে প্রভিশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিসিএস ট্যাক্স ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘ কর্মজীবন শুরু করেন।
শিক্ষাজীবনেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.কম (সম্মান) এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় প্রশাসনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এর আগে ১৯৭৯ সালে কুমিল্লার বাতাকান্দি এসএসএএইচএম হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিন্যান্স ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ফিন্যান্স বিভাগসহ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার একাডেমিক সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।
নতুন কমিশন গঠনের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করার পর কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতা পর্যালোচনার জন্য কমিটি একাধিক বৈঠক করে। ছয় দফা বৈঠকের পর চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের জন্য তিনজনের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। কমিশনের অপর সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তাদের সঙ্গে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার যোগদানে দুদকের নতুন কমিশন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।
দুদকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তে কার্যকর গতি ফিরিয়ে আনা। অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, কর ফাঁকি, সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়মিতই আলোচনায় আসে। এসব অভিযোগের তদন্তে শুধু আইনগত জ্ঞান নয়, জটিল আর্থিক লেনদেন বুঝতে পারা এবং সম্পদের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতাও প্রয়োজন। সেই জায়গায় সাজ্জাদ হোসেনের দীর্ঘ কর প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নতুন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
তবে একজন কমিশনারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দুদকের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা, পেশাগত সক্ষমতা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর। জনগণের প্রত্যাশাও এখন নতুন কমিশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের মতো জটিল বিষয়ে নতুন কমিশনের কাজের দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।
ট্যাক্স ক্যাডার থেকে দুদকের কমিশনার পদে সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নিয়োগ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পদায়ন নয়; এটি দেশের দুর্নীতি দমন কাঠামোয় রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একজন কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততার নতুন দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি দুদকের দায়িত্ব পালনে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।