স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে ঐক্য ধরে রাখার বার্তা বিএনপিতে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে ঐক্য ধরে রাখার বার্তা বিএনপিতে

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ভেতরের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি হলে তা দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের কোনো নেতাকর্মী যাতে দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেন, সে বিষয়েও আগেভাগেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। দুপুর ২টায় শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলা ওই বৈঠকে তিনি সভাপতিত্ব করেন। দলের ২৪৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৪৫ জন সভায় উপস্থিত ছিলেন। বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস এবং চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না।

বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে দলীয় নেতৃত্ব মনে করছে। এ অবস্থায় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং দলীয় ঐক্য ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, অনেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার দলের নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। সংসদ সদস্যদের জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে গত সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও উঠে আসে। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, আগের নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও একাধিক নেতার পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে কয়েকটি আসনে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য জোরদার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ায় এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। এ কারণে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনে দলের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের কেউ যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বৈঠকে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তারেক রহমান বলেন, অনেক ত্যাগ ও মূল্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির গুরুত্ব দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে বৈঠকের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের সময়। বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়।

মির্জা ফখরুল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা স্মরণ করেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি দলের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথা জানান। দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো ভুল বা অনিচ্ছাকৃত আচরণের মাধ্যমে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা চান।

তিনি বলেন, বিএনপি তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, তিনি জীবন দিয়ে হলেও সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করবেন না বলেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের সময় তাঁর আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক মিনিটের বক্তব্যে একাধিকবার তাঁকে কাঁদতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে কাজ করার পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে দলীয় সংসদীয় দলের নিয়মিত বৈঠকে আর তাঁর উপস্থিতি থাকবে না—এই বাস্তবতাও তাঁর বক্তব্যে আবেগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

তিনি দলীয় সহকর্মীদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বৈঠকে তারেক রহমানও দলীয় সংসদ সদস্যদের মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেন।

বৈঠকের শুরুতে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের বিস্তারিত ধারণা দেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁদের অবহিত করেন।

চিফ হুইপ দলীয় সংসদ সদস্যদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করা হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বৈঠকে তারেক রহমান মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মির্জা ফখরুল দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন এবং দলের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

বিএনপির সংসদীয় দলের এই বৈঠক তাই একদিকে যেমন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতির বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার আগে দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাঁর শেষ বৈঠক হিসেবে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের সমন্বয় ধরে রাখা। সংসদ সদস্যদের জনপ্রিয়তা, স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠে দলীয় ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই আগেভাগেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদারের বার্তা দিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সব মিলিয়ে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐক্য, জবাবদিহি ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুলের আবেগঘন বিদায়ী বক্তব্য দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর তাঁর নতুন দায়িত্ব শুরু হলে বিএনপির সংসদীয় রাজনীতিতে একটি পরিচিত অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত