প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট নগরীর ব্যস্ত আম্বরখানা পয়েন্টসংলগ্ন এলাকায় একটি ভবনের নিয়মবহির্ভূত অংশ ও পার্কিংয়ে গড়ে ওঠা দোকান অপসারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রশাসনিক টানাপোড়েন। অভিযোগ পাওয়ার পর একবার-দুবার নয়, গত তিন বছরে অন্তত আটবার তদন্ত করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ভবনের মালিক পক্ষকে দেওয়া হয়েছে ছয়টি নোটিশ। এর মধ্যে ছিল চূড়ান্ত নোটিশও। কিন্তু এত তদন্ত ও নোটিশের পরও সরেনি কথিত অবৈধ অংশ, বন্ধ হয়নি পার্কিংয়ের ব্যবহার। সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট উচ্ছেদ অভিযানেও গিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়াই ফিরে এসেছে সিটি করপোরেশনের আভিযানিক দল।
নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের আম্বরখানা এলাকার শীতলগলির মুখে মেইন রোডের পাশে অবস্থিত ভবনটির নাম সাত্তার ম্যানশন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ওপর যৌথ মালিকানায় তিনতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবন নির্মাণের পর মালিকদের মধ্যে হিস্যা অনুযায়ী বিভিন্ন অংশ বণ্টন হয়। পরবর্তী সময়ে ভবনের কিছু অংশ বর্ধিত করা এবং পার্কিংস্থল ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
কাগজপত্র অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাসিব তুহেল ও তাঁর ভাই আব্দুল আলিম রাসেল, তাঁদের চাচি মনোয়ারা বেগম এবং চাচাতো বোন রোকসানা লেইছ ভবনটির অংশীদার। ২০২১ সালে তুহেল, রাসেল ও মনোয়ারা তাঁদের অংশে ভবনের বর্ধিত কাজ করেন। পরে ভবনের পার্কিংয়ের জায়গা মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই পার্কিং এলাকায় দোকান পরিচালনার বিষয়টি সামনে আসার পর ভবনের অংশীদারদের মধ্যেই বিরোধের সূত্রপাত হয়।
অভিযোগকারী রোকসানা লেইছের দাবি, ভবন সম্প্রসারণের কারণে শীতলগলির মুখে মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ভবনের যে জায়গা পার্কিং হিসেবে থাকার কথা, সেটিও দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়ায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি ২০২৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়রের কাছে অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে সিটি করপোরেশন। ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান অভিযুক্ত মালিকদের নোটিশ দেন। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে ভবনের নির্দিষ্ট অংশ অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ সময় চেয়ে নেওয়ায় তখনই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
এরপর অভিযোগের ফাইলটি হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন রোকসানা লেইছ। তিনি পুনরায় ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট আবেদন করেন। নতুন করে আবেদন করার পর বিষয়টি আবারও সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আসে। এরপর গত তিন বছরে মোট অন্তত আটবার তদন্ত এবং ছয়বার নোটিশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু এতসব প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও ভবনটির কথিত নিয়মবহির্ভূত অংশ এবং পার্কিংয়ের দোকান অপসারণের কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি।
সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন নোটিশে ভবনের বিধিবহির্ভূত অংশ অপসারণ এবং পার্কিংয়ের জায়গা থেকে দোকান সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালেও দুটি চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চূড়ান্ত নোটিশের পর সাধারণত প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এরপর চলতি বছরের ১২ আগস্ট সিলেট সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্ধারিত দিনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল ঘটনাস্থলে যায়। দীর্ঘদিনের নোটিশ ও তদন্তের পর এবার হয়তো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল অভিযোগকারীসহ স্থানীয়দের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ বা অপসারণ না করেই ফিরে আসে দলটি।
অভিযান শেষে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহীর কাছে প্রতিবেদন দেন। সেখানে ভবনটির অংশীদারদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ও কিছু জটিলতার বিষয় উল্লেখ করে দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর।
আলী আকবর বলেন, উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ভবনের অংশীদারদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ও কিছু জটিলতা দেখতে পান। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগকারী রোকসানা লেইছ এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাঁর দাবি, বিষয়টি সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নয়। ভবন নির্মাণের পর নকশা না মানা এবং পার্কিংয়ের জায়গা অন্য কাজে ব্যবহারের বিষয়টি সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারভুক্ত। তাঁর অভিযোগ, তিন বছর ধরে তদন্ত ও নোটিশের মধ্যেই বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে।
রোকসানা লেইছ বলেন, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযানে গেলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন, তদন্ত ও নোটিশের পরও যদি বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে নাগরিক হিসেবে প্রতিকার পাওয়ার পথ কোথায়—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ঘটনাটি শুধু একটি ভবনের অংশ অপসারণের প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, ভবনের অনুমোদিত নকশা অনুসরণ এবং নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা ব্যবহারের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি ভবন নির্মাণের পর অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেটি পরিচালিত হচ্ছে কি না, কিংবা পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা পরবর্তী সময়ে দোকান বা অন্য ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নগর ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আম্বরখানা সিলেট নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। এখানে প্রধান সড়ক, গলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। কোনো ভবনের বর্ধিত অংশ যদি চলাচলের জায়গায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, কিংবা পার্কিংয়ের স্থান ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা শুধু মালিকদের ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সাধারণ পথচারী, যানবাহন চালক এবং আশপাশের ব্যবসায়ীদের ওপরও।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, কোনো ভবন নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেটির নিষ্পত্তি দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিয়ম অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে যদি সত্যিই নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ বা পার্কিংয়ের অননুমোদিত ব্যবহার প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার মালিকানা বা পারিবারিক বিরোধ যদি প্রকৃতপক্ষে মূল বাধা হয়ে থাকে, সেটিও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের পথ তৈরি করা জরুরি।
সাত্তার ম্যানশনকে ঘিরে গত তিন বছরের ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—আটবার তদন্ত ও ছয়বার নোটিশের পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেল না। সর্বশেষ উচ্ছেদ অভিযানও যদি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া শেষ হয়, তাহলে আগের তদন্ত ও নোটিশগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
এখন সংশ্লিষ্টদের নজর সিটি করপোরেশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হলে সেই প্রক্রিয়া কত দ্রুত শুরু হবে, আর নগর ব্যবস্থাপনার আওতাধীন অনিয়ম থাকলে সিটি করপোরেশন কী ব্যবস্থা নেবে—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এমন একটি ঘটনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে।
একদিকে ভবনের অংশীদারদের বিরোধের অভিযোগ, অন্যদিকে নকশাবহির্ভূত নির্মাণ ও পার্কিং ব্যবহারের অভিযোগ—দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করে আইনানুগ এবং নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুধু একটি ভবনকে ঘিরে তৈরি জটিলতার অবসান হবে না, নগরীর অন্যান্য ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানার বিষয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে।