সীমান্তে মাদক কারবার, বদলেছে শুধু নিয়ন্ত্রণের হাত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
সীমান্তে মাদক কারবার, বদলেছে শুধু নিয়ন্ত্রণের হাত

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক চোরাচালান ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও সীমান্তপথে মাদকের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের তথ্য থেকে মাদক চোরাচালানের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিত্র সামনে এসেছে। একই সঙ্গে মাদক পরিবহনে নতুন নতুন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, নিষিদ্ধ সিরাপ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের চালান আটকের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। গত ১৫ আগস্ট লালমনিরহাট সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৭ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আবার ১৭ আগস্ট কুমিল্লার জাগুরঝুলি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি প্রাডো গাড়ি থেকে প্রায় তিন লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, চালানটি কক্সবাজার থেকে ঢাকার দিকে নেওয়া হচ্ছিল এবং এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা সিন্ডিকেটগুলোর বিষয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় অপরাধচক্র এবং সীমান্তভিত্তিক চোরাচালান নেটওয়ার্কের মধ্যে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না; আইনগতভাবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও আদালতের ওপর নির্ভরশীল।

লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। জেলার প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বিজিবির নজরদারি রয়েছে। এর মধ্যেও বিভিন্ন দুর্গম সীমান্তপথ ব্যবহার করে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষ করে কালীগঞ্জের কিছু সীমান্ত এলাকায় মাদক পরিবহন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

কুড়িগ্রামেও সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় মাদক প্রবেশ ও পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবির অভিযানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় বিভিন্ন ধরনের মাদক জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে ১২১ কেজি গাঁজা, ৬ হাজার ৮১১ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৬ বোতল ফেনসিডিল, ২২০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও ১৪ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৭৮টি মামলা এবং ১৩৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী বালারহাট এলাকাকে ঘিরেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের কিছু চালান প্রথমে নির্দিষ্ট বাড়ি বা নিরাপদ স্থানে জমা করা হয়। পরে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে তা বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে মাদক আনার ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা দুর্গম এলাকা, নদীপথ, কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক এবং কম নজরদারির স্থান ব্যবহার করে থাকে বলে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে। কোথাও নদীপথে মাদক পার করার চেষ্টা হয়, আবার কোথাও ছোট চালান প্যাকেট বা বস্তায় বহন করে সীমান্ত পার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাচারকারীরাও পরিবহনের পদ্ধতি পরিবর্তন করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত এলাকাতেও মাদক চোরাচালান ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগরের বিভিন্ন সীমান্তপথ থেকে মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা চালান অনেক সময় স্থানীয় সড়ক, মহাসড়ক ও বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে দেশের অন্য অঞ্চলে পাঠানো হয়। এসব চালানের একটি অংশ রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে উঠে এসেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরদারিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এমনকি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুলিশের ওপর নজরদারির অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ধরনের কৌশল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে শুধু সীমান্তে টহল বাড়ানো নয়, চোরাচালানিদের যোগাযোগ ও অর্থের উৎস শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কুমিল্লার সীমান্ত পরিস্থিতিও একইভাবে উদ্বেগের। প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করে মাদক অন্য জেলায় পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় প্রায় তিন লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি এই নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জব্দ করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

মাদক পরিবহনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক কিংবা অন্যান্য যানবাহনের গোপন স্থানে মাদক লুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার নারী ও শিশুদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব বাহকের অনেকেই মূল চক্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না এবং সামান্য অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এখানেই মাদক কারবারের সবচেয়ে মানবিক ও ভয়াবহ দিকটি সামনে আসে। সীমান্তবর্তী দরিদ্র পরিবারের তরুণ, নারী কিংবা কিশোরদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত করা হলে তারা একদিকে আইনের মুখোমুখি হয়, অন্যদিকে মূল অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীরা আড়ালে থেকে যেতে পারে। ফলে শুধু বাহক গ্রেপ্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে চক্রের মূল কাঠামো ভাঙা কঠিন।

মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চালান আটকের ঘটনা দৃশ্যমান হলেও এর পেছনে থাকা অর্থের প্রবাহ অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। হুন্ডি, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদকের অর্থ সরানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কারা যুক্ত, তা শনাক্ত করতে আর্থিক গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্তবর্তী মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ বদলে যাওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও মনে করছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু সীমান্তে অভিযান যথেষ্ট নয়। সীমান্ত থেকে দেশের অভ্যন্তরে মাদক পৌঁছানোর পর কোথায় তা জমা হচ্ছে, কারা পরিবহন করছে, কারা অর্থ দিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কারা বড় পরিসরে বাজারজাত করছে—পুরো চেইন শনাক্ত করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা ও আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ স্থানীয় মানুষই অনেক সময় দুর্গম সীমান্তপথে অস্বাভাবিক চলাচল বা অপরিচিত ব্যক্তিদের গতিবিধি সম্পর্কে প্রথম তথ্য দিতে পারেন।

মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযান ও জব্দের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে মূল সিন্ডিকেট, অর্থদাতা ও সংগঠকদের বিচারের আওতায় আনার ওপর। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার দ্রুত তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকর অগ্রগতিও নিশ্চিত করতে হবে।

সীমান্তে মাদকের প্রবাহ বন্ধ করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন এবং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। সীমান্তপথে প্রতিটি নতুন চালান শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরের কোনো না কোনো পরিবারে পৌঁছায়। তাই সীমান্তে মাদক ঠেকানোর লড়াই মূলত দেশের ভেতরে একটি প্রজন্মকে মাদকের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার লড়াইও।

সাম্প্রতিক অভিযানে বড় বড় চালান আটকের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার প্রমাণ দিলেও একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে, চোরাচালান নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। তাই সীমান্তে নজরদারি, অভ্যন্তরীণ পরিবহন রুটে অভিযান, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী আশ্রয়ের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত—এই চার ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়া না হলে মাদকের মূল প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত