প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে কওমি মাদরাসাভিত্তিক বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত, যিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও মতাদর্শ সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং আলেম সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সংগঠনটির লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী। তিনি বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীম কায়সার লিংকনকে মনোনীত করার খবর দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তাঁরা মনে করেন।
তবে প্রেস ব্রিফিংয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সংগঠনটির নেতাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক-ধর্মীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে শামীম কায়সার লিংকনের কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর অবস্থান বা আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, শামীম কায়সার লিংকন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মতাদর্শ ও চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নন। তিনি লিংকনের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন এবং বলেন, ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দেশের আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, লিংকন পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও চার মাজহাবের বিরোধী এবং লা-মাজহাবি আকিদায় বিশ্বাসী। তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে লিংকনের নিজস্ব অবস্থান বা ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তারা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের বিষয়টি তুলে ধরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আলেম সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তি দায়িত্বে থাকলে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে সমন্বয় সহজ হতে পারে।
মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, হজ ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের সঙ্গে এ মন্ত্রণালয় জড়িত। তাই এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাঁর ধর্মীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তারা সরকারের সঙ্গে আলেম সমাজের সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, বর্তমান সরকার নিজেদের ইসলামবান্ধব সরকার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। একই সঙ্গে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে দেশের আলেম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে আলেম সমাজের দাবি উপেক্ষা করা হলে সরকার ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক আস্থায় দূরত্ব তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তাঁরা। মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, এমন দূরত্ব তৈরি হলে তা সহজে মেরামত করা কঠিন হতে পারে। তাই ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে আলেমদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর পদটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। হজ ব্যবস্থাপনা, ওয়াক্ফ সম্পত্তি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সম্প্রীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হয়। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দক্ষতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
তবে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি ধর্মীয় সংগঠনের মতামত নয়, সাংবিধানিক কাঠামো, রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে কওমি আলেমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবি এখন সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তারা আরও বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন ব্যক্তিকে দেখতে চান তাঁরা, যিনি আলেম সমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন এবং ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের পরামর্শ বিবেচনায় নেবেন। তাঁদের মতে, এতে সরকার ও ধর্মীয় সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এ সময় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হামিদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মুফতি নাজমুল হাসান কাসেমী, জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম খিলগাঁওয়ের মুহতামিম মাওলানা জহুরুল ইসলাম এবং হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরুল্লাহসহ বিভিন্ন কওমি মাদরাসা ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে এই আপত্তি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন নতুন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। ফলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কে আসছেন, তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কেমন হবে এবং আলেম সমাজের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কীভাবে এগোবে—এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সঙ্গে এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সরকারকে বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি দেশের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো, সব ধর্মের মানুষের অধিকার এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টিও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখার দাবি উঠতে পারে।
কওমি আলেমদের সংগঠনটি অবশ্য তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। তারা চায়, সরকার উলামায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা করে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর জন্য একজন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিক। তাদের বক্তব্য, এতে ধর্মীয় অঙ্গনের মানুষের আস্থা বাড়বে এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এখন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের। শামীম কায়সার লিংকনকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা আসে কি না এবং সরকার আলেম সমাজের দাবিকে কীভাবে বিবেচনা করে, সেটিই পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। একই সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, যিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় অঙ্গনে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেষ পর্যন্ত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত সরকারের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে। তবে কওমি আলেমদের এই প্রকাশ্য আপত্তি দেখিয়ে দিয়েছে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব শুধু রাজনৈতিক পদায়নের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের একটি বড় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, মূল্যবোধ ও আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।