যানজট নিয়ন্ত্রণে ড্রোনে নজরদারি, আসছে ভিডিও মামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
যানজট নিয়ন্ত্রণে ড্রোনে নজরদারি, আসছে ভিডিও মামলা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর দীর্ঘস্থায়ী যানজট ও সড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ক্যামেরার পর এবার পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন সার্ভিলেন্স চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, যানজটপ্রবণ এলাকা, ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে ড্রোনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ড্রোন সার্ভিলেন্স চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে একটি ড্রোন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যান চলাচলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও হঠাৎ যানজট তৈরি হলে তার কারণ দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে ডিএমপি।

রাজধানীর যানজটের চিত্র প্রতিদিনই ভিন্ন রূপ নেয়। কোথাও একটি গাড়ি বিকল হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়, আবার কোথাও বাসের যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং কিংবা সড়কে এলোমেলোভাবে যানবাহন থামানোর কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নিচ থেকে এসব পরিস্থিতির পুরো চিত্র অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো উঁচু সড়কব্যবস্থায় যানজটের উৎস কোথায়, তা নির্ধারণ করতে সময় লাগে। ড্রোনের আকাশপথের নজরদারি এ ক্ষেত্রে দ্রুত পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।

মো. আনিছুর রহমান জানান, ড্রোনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য একেবারে রিয়েল টাইমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ জন্য প্রয়োজন হবে যথাযথ ইন্টারনেট সংযোগ, সার্ভার, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার সঙ্গে আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টিও জড়িত। ফলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ড্রোনের সঙ্গে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন বা এএনপিআর প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি চালু করা সম্ভব হলে আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী যানবাহন শনাক্ত করা সহজ হবে। ভবিষ্যতে ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে ডিএমপি সরাসরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার পর্যায়ে যায়নি। আইন ভঙ্গের ফুটেজ আগে বিশ্লেষণ করে তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের এই কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য মামলা বাড়ানো নয়; বরং সড়কে মানুষের আইন মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করা। কারণ বেশি মামলা হওয়া কোনোভাবেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। বরং মানুষ যদি আইন মেনে চলতে শুরু করে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসে, সেটিই হবে কাঙ্ক্ষিত ফল।

ড্রোনে শুধু ক্যামেরা থাকবে না, সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো যানবাহন যদি এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে বা চলাচল করে, যার কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে, তখন ড্রোন থেকে শব্দ বা ভয়েসের মাধ্যমে চালককে সতর্ক করা যাবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিটি শুধু নজরদারি করবে না, পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে চালকদের সড়ক থেকে সরে যেতে বা আইন মেনে চলতেও নির্দেশ দিতে পারবে।

তবে রাজধানীর যানজটের পেছনে শুধু চালকদের আইন না মানাকে দায়ী করছেন না ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সমস্যাও যানজটের অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে বাসগুলো নির্দিষ্ট বাসস্টপে না থামায় সড়কে একাধিক সমস্যা তৈরি হয়। যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য যেখানে-সেখানে বাস থামানোর ফলে পেছনে থাকা যানবাহনের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে সেই ছোট বাধাই বড় যানজটে রূপ নেয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, বাসগুলো অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত না হওয়ায় যাত্রী পাওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। ফলে বাসস্টপের পরিবর্তে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় বাস দাঁড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়। এতে সড়কের একটি বড় অংশ আটকে যায় এবং অন্য যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়।

তার মতে, উন্নত দেশগুলোতে গণপরিবহনের সময়সূচি, বাসের অবস্থান এবং নির্দিষ্ট স্টপেজ ব্যবহারের বিষয়টি একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও কার্যকর ই-টিকিটিং ব্যবস্থা ও বাস রুট রেশনালাইজেশন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাসগুলোর প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী তোলার প্রবণতা কমানো গেলে সড়কে যানজটের চাপও অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে।

ড্রোন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরিতেও কাজ শুরু করেছে ডিএমপি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড্রোন পরিচালনা একটি কারিগরি বিষয় হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে তেজগাঁও বিভাগে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সেখানে একটি দল প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পরবর্তী ধাপে উত্তরা বিভাগের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শাহবাগ থেকে শুরু করে ১৪টি এবং লেক রোডে একটি, মোট ১৫টি সিগন্যাল এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আনিছুর রহমান। এর পাশাপাশি ডিএমপির অন্যান্য সিগন্যাল নিয়েও কাজ চলছে।

নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোতে চায় ডিএমপি। কারণ প্রযুক্তি চালু করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এআই ক্যামেরা ও ড্রোন সার্ভিলেন্স ব্যবস্থায় ত্রুটি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কিংবা ভুল শনাক্তকরণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে রাজধানীর সড়কে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পৌঁছানো গেলে যানজট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতে পারে। কোথায় যানবাহনের চাপ বাড়ছে, কোন সড়কে গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে কিংবা কোথায় কোনো ঘটনা পুরো সড়কব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে—এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে ট্রাফিক পুলিশ আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে পারবে।

তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি চালকদের সচেতনতা, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার সংস্কার এবং সড়ক আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ড্রোন আকাশ থেকে নজর রাখতে পারবে, এআই ক্যামেরা আইন ভঙ্গ শনাক্ত করতে পারবে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর যানজট কমাতে প্রয়োজন হবে সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা ও নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ। ডিএমপিও বলছে, তাদের লক্ষ্য মামলা বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলবে এবং নগরবাসীর প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত