নতুন পে স্কেলের অর্থ জোগাতে ঋণ নেবে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
নতুন পে স্কেলের অর্থ জোগাতে ঋণ নেবে সরকার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণ নিয়েও নতুন পে স্কেলের ব্যয় মেটানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের অর্থের সংস্থান নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে সেই অর্থ যথেষ্ট না হলে সরকার ঋণের পথও বিবেচনা করবে।

নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে। বেতন কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতা, অবসর-পরবর্তী সুবিধা এবং সরকারি ব্যয়ের আরও কিছু খাতের ওপরও প্রভাব পড়ে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এর আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, সাধারণত একটি নতুন পে স্কেল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি পর্যায়ে কাজ সম্পন্ন হয়। এরই মধ্যে প্রক্রিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগিয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পে কমিশন বা কমিটিগুলো তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে। এরপর এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়ার কাজ হয়। সবশেষে মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তিনি জানান, সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর বিষয়ে পে সার্ভিস কমিশন প্রতিবেদন দেয়। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংশ্লিষ্ট পে কমিটি এবং বিচার বিভাগের জন্য জুডিশিয়াল পে কমিশন কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিবেদনের বিষয়ে সচিব কমিটি ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। অর্থাৎ নতুন পে স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু একটি কমিশনের সুপারিশের ওপর নির্ভর না করে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগের পে স্কেলের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত একটি কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বাস্তবতা, বিষয়টির সংবেদনশীলতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

এই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার মাধ্যমে পে স্কেল প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে বিষয়টি মন্ত্রিসভার সামনে যাবে। কোন প্রস্তাব কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কোন বিষয় কখন থেকে কার্যকর হবে এবং নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভা নেবে।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান। সরকারি বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় বাড়লে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য সরকারি অগ্রাধিকারের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এ কারণে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব বিবেচনা করে অর্থের উৎস নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তর থেকে সরকারের রাজস্ব ও অন্যান্য সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো গেলে নতুন বেতন কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারের নিজস্ব অর্থের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।

তবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ পুরোপুরি পাওয়া না গেলে ঋণ নেওয়ার বিকল্পও খোলা রাখা হয়েছে। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ঋণ নেওয়া হবে। তার মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ঋণ নেওয়াকে তিনি নিজে কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণও বাড়ে। মূল্যস্ফীতি, বাজারদর এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারি কর্মীদের আয় সমন্বয়ের বিষয়টি তাই পে স্কেল আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হয়।

নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশার পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকদের কাছেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেতন-ভাতা খাতে বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় হলে তা সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে সরকারি কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে, যা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে নতুন পে স্কেল এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্ট কমিশন ও কমিটির সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যালোচনা এবং মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের পরই বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্টতা তৈরি হবে। কোন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত হবে, কতটা বাড়ানো হবে এবং কখন থেকে তা কার্যকর হবে—এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

সরকারের বর্তমান বক্তব্যে অর্থের সংস্থান নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য শুধু বাজেটের বিদ্যমান অর্থের ওপর নির্ভর করা হবে না। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণের মাধ্যমেও অর্থের ব্যবস্থা করা হবে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পর সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। কমিশন ও কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার পর নতুন পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখানে বেতন কাঠামো, বাস্তবায়নের সময়সূচি, আর্থিক প্রভাব এবং অর্থের সংস্থানসহ সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো কবে এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত