চট্টগ্রাম নগরীর আয়তন ১১০০ বর্গকিমি বাড়ানোর পরিকল্পনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
চট্টগ্রাম নগরীর আয়তন ১১০০ বর্গকিমি বাড়ানোর পরিকল্পনা
default

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম মহানগরকে ভবিষ্যতের জনসংখ্যা, পরিবেশ, আবাসন ও অবকাঠামোগত চাপ মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত ও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান ১৫৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নগর এলাকা বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটারে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শুধু নগরের সীমানা বাড়ানো নয়, বরং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সিডিএর ২৫ বছর মেয়াদি চট্টগ্রাম সিটি মাস্টারপ্ল্যানের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জনসংখ্যা, আবাসন চাহিদা, সড়ক যোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিল্পায়ন, কৃষিজমি, পর্যটন এবং ঐতিহ্য রক্ষার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি তৈরি করা হচ্ছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে নাগরিকদের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও চলছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, অংশীজনদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হবে।

গত ২ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া গণশুনানি চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ে নগরবাসী সরাসরি সিডিএ কার্যালয়ে গিয়ে প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যান সম্পর্কে নিজেদের মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ জানাতে পারছেন। যারা সরাসরি উপস্থিত হতে পারছেন না, তাদের জন্য অনলাইনে মতামত জানানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা করছে সিডিএ।

সিডিএ সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আলোচনায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব আলোচনায় মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। কারণ, একটি শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু কাগজে-কলমে তৈরি করলে তা কার্যকর করা কঠিন। মানুষের বসবাস, জীবিকা, যোগাযোগ ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গণশুনানিতে নাগরিকদের আগ্রহের বড় একটি অংশ জমির শ্রেণি ও ভবন নির্মাণের অনুমোদনকে ঘিরে। কেউ জানতে চাইছেন তাঁদের জমি কৃষি, জলাশয়, পাহাড় কিংবা আবাসিক এলাকার কোন শ্রেণিতে পড়ছে। আবার কেউ মাস্টারপ্ল্যানে প্রস্তাবিত সড়ক বা গ্রিন জোনের কারণে ভবিষ্যতে তাঁদের জমির ব্যবহার কীভাবে প্রভাবিত হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইছেন। পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ করলে জমির মালিকরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নতুন মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশ সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার আওতাধীন ভূমির ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষির জন্য রাখা হয়েছে ৩১ দশমিক ৯২ শতাংশ এলাকা। বাণিজ্যিক এলাকার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ দশমিক ৩২ শতাংশ ভূমি। বিমানবন্দর ও বাস-ট্রাক টার্মিনালের জন্যও আলাদা ভূমি শ্রেণি রাখা হয়েছে।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পুকুর, দিঘি, জলাশয় ও পাহাড় সংরক্ষণে। প্রায় ৩৯ হাজার ৮৪৫টি পুকুর, দিঘি ও পাহাড় সংরক্ষণের বিষয়টি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রাখার কথা বলা হয়েছে। নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় কেটে বসতি বা স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ না করলে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন বাস্তবতা সামনে রেখেই এ ধরনের বিধিনিষেধের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপও মাস্টারপ্ল্যানের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সিডিএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩১ সালে নগরের জনসংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ ৮৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে। ২০৪১ সালে তা বেড়ে ৭৭ লাখ ১২ হাজার এবং ২০৫০ সালে প্রায় ৮৬ লাখ ৫৩ হাজারে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বর্তমান নগর কাঠামো যথেষ্ট হবে না বলেই বিস্তৃত পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

পরিকল্পনার আওতায় নগর সম্প্রসারণের পাশাপাশি একাধিক পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। আনোয়ারা উপজেলায় ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ ধারণায় একটি স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূল চট্টগ্রাম শহরের ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চায়না ইকোনমিক জোনও প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় রয়েছে। এর ফলে শিল্পায়ন ও নগর সম্প্রসারণের মধ্যে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার আটটি উপজেলাকেও বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে শুধু বর্তমান মহানগরকেন্দ্রিক না রেখে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নগর কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে।

শহরের সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপিয়ান ক্লাব, হাতির বাংলো, অলি খাঁ মসজিদ, নন্দিরহাট জমিদার বাড়ি, হাটহাজারীর পাঁচকড়ি জমিদার বাড়ি এবং হাম্মাদিয়া জামে মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনায় সুপারিশ রাখা হয়েছে। নগরের আধুনিকায়নের সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

সিডিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণশুনানিতে ইতোমধ্যে ম্যানুয়ালি প্রায় ৪০০টি এবং অনলাইনে শতাধিক মতামত পাওয়া গেছে। প্রায় ৮০০ মানুষ গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন। এসব মতামত যাচাই-বাছাই করে মাস্টারপ্ল্যানে প্রয়োজনীয় সংযোজন বা সংশোধন করা হবে। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে সংসদ সদস্য, মেয়র, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু আইন সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শুধু সিডিএর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থা, সড়ক ও যোগাযোগ কর্তৃপক্ষ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হবে।

সিডিএর কর্মকর্তারা বলছেন, মাস্টারপ্ল্যানের শেষ পর্যায়ে এখন বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি যাচাই করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ইতোমধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে।

তবে এত বড় পরিসরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নাগরিকদের প্রত্যাশার পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বর্তমান জমির ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ ভূমি শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, সেসব এলাকার জমির মালিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আবার পরিবেশ রক্ষার নামে কোনো জমির ব্যবহার সীমিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের জন্য কী ধরনের নীতিগত সহায়তা থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই মাস্টারপ্ল্যানটি চূড়ান্ত করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি যুগোপযোগী ও বৈজ্ঞানিক করার পাশাপাশি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির কারণে ভবিষ্যতে এ নগরের গুরুত্ব আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়বে জনসংখ্যা, আবাসন ও যোগাযোগের চাপ। ফলে বর্তমান নগরকে শুধু বড় করার পরিবর্তে কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলবে, কোথায় কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা হবে এবং কোথায় নতুন সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি হবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে পরিকল্পনাটিকে বাস্তবে কার্যকর করা। অতীতে বিভিন্ন নগর পরিকল্পনা প্রণীত হলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে নতুন মাস্টারপ্ল্যান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নাগরিক মতামত কতটা গুরুত্ব পায়, পরিবেশগত বিধিনিষেধ কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিস্তৃত এই পরিকল্পনা ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত নগরে রূপ দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত