গার্ড অব অনারে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রোববার (২৩ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে বঙ্গভবনে পৌঁছালে তাকে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় স্বাগত জানানো হয়। প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি চৌকস দল নতুন রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ বিরোধী রাজনীতিতে কাটানো মির্জা ফখরুলের জন্য রোববারের সকালটি ছিল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। কয়েক দিন আগেও তিনি ছিলেন সক্রিয় দলীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ। এখন তার কর্মস্থল বঙ্গভবন আর দায়িত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।

রাষ্ট্রপতির প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, মির্জা ফখরুল সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন। বেলা ১১টায় বঙ্গভবনের প্রধান ফটক-২-এ পৌঁছানোর পর বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল তাকে অভ্যর্থনা জানায়। পরে তাকে ক্রেডেনশিয়াল মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সুসজ্জিত দল রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার প্রদান করে। একই সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সামরিক ব্যান্ড স্বাগত সুর পরিবেশন করে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বঙ্গভবনে এটিই ছিল মির্জা ফখরুলের প্রথম আনুষ্ঠানিক সামরিক অভিবাদন।

গার্ড অব অনারের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের অক্টাগনালে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন, জনবিভাগের সচিব এ জে এম সালাহউদ্দিন নাগরী, প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এবং পিজিআর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলম রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।

এরপর নিজের কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল। প্রথম কর্মদিবসেই তিনি বিভিন্ন সরকারি নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে বঙ্গভবনের পরিদর্শন বইয়েও স্বাক্ষর করেন তিনি।

রোববার বঙ্গভবনে তার এই আনুষ্ঠানিক যাত্রার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে সাম্প্রতিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় সম্পন্ন হলো। শুক্রবার শপথ নেওয়ার পর শনিবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নতুন রাষ্ট্রপতি। এরপর রোববার শুরু হলো বঙ্গভবনে তার নিয়মিত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ২৫৫ ভোট পান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সও নির্বাচনের ফল এবং মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে এবারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল ব্যতিক্রমী। ১৯৯১ সালের পর প্রথমবার রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে সংসদীয় ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বলে বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন।

ভোট গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসারে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

নির্বাচনের পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেন মির্জা ফখরুল। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান। বাসস ও এনটিভিসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম শপথ অনুষ্ঠানের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

শপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সাল থেকে দলটির মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবেও দীর্ঘ সময় আলোচনায় ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর সক্রিয় দলীয় নেতৃত্ব থেকে তার সাংবিধানিক দায়িত্বে উত্তরণ দেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারও নতুন পরিণতি ঘটেছে। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিক পরে সরকারি চাকরি এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা, কারাবরণ এবং দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক জীবনের পর রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে তার যাত্রা স্বাভাবিকভাবেই দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে। রয়টার্স মির্জা ফখরুলকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় অধিকাংশ নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে থাকলেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সাংবিধানিক নিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত ভূমিকা রয়েছে।

ফলে মির্জা ফখরুলের সামনে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে উঠে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রত্যাশাও থাকবে। দীর্ঘ সময় একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে সব নাগরিক ও রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী সাংবিধানিক অবস্থানে দায়িত্ব পালন তার নতুন অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরদিন শপথ এবং তার পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রথম ধাপগুলো সম্পন্ন করেন মির্জা ফখরুল। শনিবার সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এর পরদিন বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার নিয়মিত কার্যক্রমের সূচনা ঘটল।

বঙ্গভবন শুধু রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম, রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার বড় অংশ এখানেই সম্পন্ন হয়।

রোববার সকালে সেই বঙ্গভবনের প্রধান ফটকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে যে আনুষ্ঠানিকতা দেখা গেছে, তা ছিল রাষ্ট্রের নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীকী একটি মুহূর্ত। অশ্বারোহী পুলিশের অভ্যর্থনা, পিজিআরের গার্ড অব অনার এবং তিন বাহিনীর সমন্বিত সামরিক ব্যান্ডের স্বাগত সুরের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।

এরপর অফিসকক্ষে বসে সরকারি নথিতে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নতুন কর্মজীবন। কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে বসে সেই প্রথম স্বাক্ষর তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় নতুন এক বাঁকের প্রতীক হয়ে থাকল।

এখন থেকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক পরিচয়ের দীর্ঘ অধ্যায় পেছনে রেখে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো তার। বঙ্গভবনে রোববারের গার্ড অব অনার সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে জায়গা করে নিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত