তথ্য মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ নয়, রেগুলেট করবে: পার্থ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণমাধ্যম কিংবা তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পথে না গিয়ে প্রয়োজনীয় নিয়মনীতি ও দায়িত্বের কাঠামোর মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার বার্তা দিয়েছেন নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কর্মদিবসেই তিনি স্পষ্ট করেছেন, মন্ত্রণালয় তার নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব পালন করবে, তবে সেই দায়িত্ব যেন কোনোভাবেই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় রূপ না নেয়।

রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়কালে নিজের কাজের অগ্রাধিকার তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমাদের মাথায় রাখতে হবে, আমরা অবশ্যই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রেগুলেট করব। কিন্তু কোনোভাবেই যেন আমরা কন্ট্রোলের দিকে না যাই।”

নতুন সরকারের যাত্রার শুরুতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়াকে বড় সুযোগ হিসেবেও দেখছেন আন্দালিব রহমান পার্থ। এজন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান তিনি। দায়িত্ব পালনে সততা, নৈতিকতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এমন এক সময়ে তিনি গ্রহণ করেছেন, যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ‘রেগুলেশন’ ও ‘কন্ট্রোল’-এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

মন্ত্রী সরকারের উন্নয়নমূলক ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, সরকারের ইতিবাচক কাজ মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে হবে সততা ও আস্থার সঙ্গে। অর্থাৎ সরকারি তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে শুধু ইতিবাচক বার্তা নয়, সেই বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের জাতীয় অর্জন এবং মানুষের গর্বের জায়গাগুলো ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার দায়িত্বের কথাও বলেন তথ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং জাতীয় অর্জনের সঙ্গে গণমাধ্যম ও তথ্যব্যবস্থার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব তৈরিতে মন্ত্রণালয়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত কঠিন একটি সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। নতুন সরকারের সামনে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এসব মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

“আমরা ১০০ শতাংশ এফোর্ট দিচ্ছি। ভুল-ত্রুটি তো হবেই, আমাদের সবারই হতে পারে। কিন্তু নৈতিকতার জায়গা থেকে আমরা খুবই স্ট্রং,” বলেন তথ্যমন্ত্রী।

তার এই বক্তব্যে নতুন সরকারের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি দিকও উঠে এসেছে। সরকারের কাজে ভুল হতে পারে—এমন বাস্তবতা স্বীকার করার পাশাপাশি নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো ধরনের অন্যায় যেন সরকারের মাধ্যমে না ঘটে, সেদিকেও নজর রাখার কথা বলেছেন।

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে গণমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে জুলাই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ওই সময় সংবাদ সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং বিভিন্ন তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা ছিল আলোচিত। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।

নতুন তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য শুধু পুরোনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নয়। বরং যেসব জায়গায় ক্ষতি হয়েছে সেগুলো মেরামতের পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান তারা।

আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, “আমাদের ইচ্ছা বাংলাদেশকে একটা নতুন দিকে নিয়ে যাওয়ার। সবচেয়ে বড় কথা, যে ড্যামেজগুলো হয়েছে সেগুলো রিপেয়ার করা এবং নিউ সিস্টেম ডেভেলপ করা।”

কোন কোন ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা হবে কিংবা তথ্য ও সম্প্রচার খাতের বিদ্যমান কাঠামোয় কী ধরনের সংস্কার আসবে, প্রথম দিনের বক্তব্যে তার বিস্তারিত রূপরেখা দেননি মন্ত্রী। তবে ‘নিয়ন্ত্রণ নয়, রেগুলেশন’ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থা সংস্কারের যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তার বাস্তব প্রয়োগ আগামী দিনের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথ্যপ্রবাহের বড় অংশ দখল করেছে। ফলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাজের ক্ষেত্রও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সংবাদ, মতামত, ভুল তথ্য এবং উদ্দেশ্যমূলক অপতথ্য প্রায় একই গতিতে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অন্যদিকে আইনসম্মত জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তথ্যমন্ত্রীর ‘রেগুলেট করব, কন্ট্রোল নয়’ বক্তব্য সেই ভারসাম্যের প্রশ্নকেই সামনে এনেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে পেশাগত মান, আইনি কাঠামো এবং জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রণের নামে স্বাধীন সাংবাদিকতা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়—এ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই সাংবাদিক সমাজ ও অধিকারকর্মীদের আলোচনায় রয়েছে।

নতুন দায়িত্বে আন্দালিব রহমান পার্থ তাই এমন একটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের গণমাধ্যম পরিবেশ এবং তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনা থেকে সম্প্রচার নীতি পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এই মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে।

মন্ত্রী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলগতভাবে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারের মাধ্যমে কোনো অন্যায় যেন না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আগামী দিনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন এবং সম্মিলিতভাবে ভালো কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রথম কর্মদিবসে নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই সচিবালয়ে পৌঁছান তথ্যমন্ত্রী। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে তিনি মন্ত্রণালয়ে আসেন। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়ে অংশ নেন তিনি।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আন্দালিব রহমান পার্থ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ছিলেন। জাতীয় সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে এখন তার সামনে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসেছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে তার প্রথম দিনের বক্তব্য তাই ভবিষ্যৎ নীতির একটি প্রাথমিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষত গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বদলে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একইভাবে নাগরিকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফলে সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সমালোচনা, ভিন্নমত এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও গণমাধ্যমের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দিনের বক্তব্যে আন্দালিব রহমান পার্থ যে নৈতিকতা, সততা, দলগত কাজ এবং নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার কথা বলেছেন, আগামী দিনে তার মন্ত্রণালয়ের নীতি ও সিদ্ধান্তে সেসব অঙ্গীকারের প্রতিফলনই এখন দেখার বিষয়। কারণ গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক শুধু তথ্য প্রচারের নয়; জনগণের জানার অধিকার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের সঙ্গেও এই সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত