রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। শুরুতে ডাকাতির সময় হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা হলেও তদন্তে ভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার জেরে পরিবারের সদস্যদের একে একে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনায় সন্দেহভাজনদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিহতদের কয়েকজনের নাম ও বয়সের বানানে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে।

মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে রহস্য তৈরি হয়। কারণ চারজনের মরদেহ বাড়ির চারটি ভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছিল বাড়ির ছাদে। স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ পাওয়া যায় সিঁড়িতে। আর মাত্র ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয় একটি কক্ষের খাটের নিচ থেকে।

বাড়ির ভেতরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় প্রথমদিকে ডাকাতির সম্ভাবনা সামনে আসে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল বলে স্বজনদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে পরিবারের স্বজনদের কেউ কেউ শুরু থেকেই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

তবে রোববার দুপুর নাগাদ তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতির কথা জানায় পুলিশ। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন দুই তরুণ ওই বাড়ির নির্মাণাধীন অংশের ছাদে নিয়মিত আড্ডা দিতেন এবং মাদক সেবন করতেন। ঘটনার রাতে তারা সেখানে মাদক সেবন করছিলেন বলে তদন্তকারীদের কাছে তথ্য দিয়েছেন। বিষয়টি গণপতি চক্রবর্তীর নজরে পড়লে তিনি বাধা দেন। এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশ বলছে, প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী ঘটনাস্থলে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য প্রিয়ম অভিযুক্তদের চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ।

চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়ির ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলেন বলেও তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর তারা ওই বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খাওয়ার পাশাপাশি সেখানে ইয়াবা সেবন করেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা হয়ে গেলে স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।

আলামত নষ্ট করার চেষ্টার বিষয়েও তথ্য পেয়েছে পুলিশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে বলা হয়েছে, দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ফোনে থাকা সম্ভাব্য তথ্য কিংবা অন্য কোনো আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।

হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে প্রতিবেশী ও স্বজনেরা প্রথমদিকে বুঝতে পারেননি ভেতরে কী ঘটেছে। কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের বাইরে দেখা না যাওয়ায় এবং মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে না পারায় স্বজনদের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়েছিল। শনিবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে সবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে যান। সেখানে পৌঁছে প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়।

স্থানীয়দের বরাতেও জানা গেছে, বেশ কিছু সময় ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল। একপর্যায়ে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থান থেকে চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহগুলোর অবস্থান তদন্তকারীদের সামনে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। ছাদে বাবা, সিঁড়িতে মা ও মেয়ে এবং খাটের নিচে ছোট ছেলের মরদেহ পাওয়ার কারণে ধারণা করা হয়, একই জায়গায় চারজনকে হত্যা করা হয়নি। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী একে একে পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন।

মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থীকে হত্যার সময় ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটেছিল বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণী প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়।

ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটকের খবর প্রকাশিত হলেও পরবর্তী পুলিশ ব্রিফিংয়ে দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। তারা হলেন মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস (২৩) এবং সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।

তবে তদন্ত চলমান থাকায় আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আসা ব্যক্তিদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাদের দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। পুলিশও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না কিংবা এর পেছনে আরও কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেসব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নিহত গণপতি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অবসরের পর রংপুর কো-অপারেটিভ মার্কেটে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন বলে স্বজন ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে।

তার মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছোট ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাবা দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন, সেখানেই পড়ছিল পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান।

একটি পরিবারের চারজন সদস্যের এমন মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পরিচিত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়ির আশপাশে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে।

প্রথমদিকে ডাকাতির সন্দেহ এবং স্বজনদের পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনার কারণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। এখন পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে একই সঙ্গে বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিস নেওয়ার অভিযোগ থাকায় হত্যার পর লুটপাটের বিষয়টিও তদন্তের অংশ হয়ে রয়েছে।

মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষা, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

চার সদস্যের একটি পরিবার কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিবেশীদের চোখের সামনে থেকে যেন হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল। বাইরে তালা ঝুলছিল। ফোনগুলো বন্ধ ছিল। ভেতরে পড়ে ছিল চারটি নিথর দেহ। শনিবার রাতে সেই তালা ভাঙার পর যে দৃশ্য সামনে আসে, তা এখন রংপুরের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে একটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এলেও বহু প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ। কারা সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছেন, অন্য কেউ সহযোগিতা করেছেন কি না, হত্যার পর কী কী লুট করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার পেছনে আর কোনো বিরোধ কাজ করেছে কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে সংগৃহীত আলামত যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। চারজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা তরুণী কন্যা এবং স্কুলপড়ুয়া ছোট ছেলের মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাবোধেও গভীর আঘাত তৈরি করেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে দায়ীদের যথাযথ বিচার হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন নিহতদের স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত