আদমজী ইপিজেডে ‘ভূত’ আতঙ্ক, অসুস্থ শ্রমিকরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) একটি পোশাক কারখানায় টানা দুই দিন শ্রমিকদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের একাংশ কারখানায় ‘ভূত দেখার’ দাবি করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঠিক কী কারণে শ্রমিকরা অসুস্থ হচ্ছেন, সেটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববার (২৩ আগস্ট) ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডে একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার দুপুরের পর। আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডের নতুন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে কয়েকজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর সময় যত গড়ায় আরও শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর আসতে থাকে। একপর্যায়ে অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে শ্রমিকদের বরাতে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

হঠাৎ এত শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় শনিবারই কারখানার ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়। অসুস্থ শ্রমিকদের আদমজী ইপিজেডের বেপজা মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার কথাও জানা গেছে।

তবে ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। রোববার সকালে শ্রমিকরা আবার কর্মস্থলে ফিরলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দ্রুত অন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কারখানার ভেতরে ছোটাছুটি শুরু হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ সেদিনের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে।

ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার বিল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, রোববার প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। এরপর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ দিনের জন্য কারখানা ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে অসুস্থ শ্রমিকের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ ১৫ থেকে ২০ জনের কথা বললেও বেপজার একজন কর্মকর্তা ৫ থেকে ৭ জনের অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন। আবার একজন শ্রমিকের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববারও ৫০ জনের বেশি অসুস্থ হন। ফলে যাচাই করা সরকারি হিসাবে আক্রান্তের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনাটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ‘ভূত আতঙ্ক’। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শনিবার এক নারী শ্রমিক কারখানার ভেতরে কথিত ‘ভূত’ দেখেছেন বলে দাবি করেন। এরপর তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হলে দ্রুত সেই ভয় অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়।

তবে কথিত অতিপ্রাকৃত ঘটনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কর্মকর্তারাও এমন দাবিকে সমর্থন করেননি। তারা বরং শ্রমিকদের অসুস্থতার বাস্তব কারণ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

কারখানার জিএম বিল্লাল হোসেন বলেন, অনেক শ্রমিক ভূত দেখার কথা বলছেন। তবে সচেতন মানুষ হিসেবে এমন বিষয় বিশ্বাস করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে অসুস্থতার ঘটনা কারখানার শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটছে না বলেও জানান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিভার্সেল মেনসওয়্যার লিমিটেডে শ্রমিকদের আরামের বিষয় বিবেচনা করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই অতিরিক্ত গরম কিংবা বদ্ধ পরিবেশের কারণে অসুস্থতা ঘটছে কি না, সেটিও সরাসরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অসুস্থতার প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

বেপজার কর্মকর্তারাও কারখানা পরিদর্শন করেছেন। আদমজী ইপিজেডের বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক নাসরিন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি সরেজমিনে কারখানাটি ঘুরে দেখেছেন। সেখানে দমবন্ধ হওয়া কিংবা শ্বাসরোধ তৈরি করতে পারে এমন স্পষ্ট কোনো পরিস্থিতি তাদের চোখে পড়েনি।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের অনেকে ভূতের কথা বলছেন। তবে প্রকৃত কারণ কী, সেটিই নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শনিবারের ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে অসুস্থতার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাপজনিত সমস্যার কথাও সামনে এসেছিল। ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের (ইউএনবি) প্রতিবেদনে বেপজার একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, শ্রমিকদের প্রাথমিকভাবে হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সেই ধারণাই চূড়ান্ত কারণ—এমন কোনো সিদ্ধান্ত তখন দেওয়া হয়নি।

ফলে ঘটনাটির কারণ নিয়ে অনুমানের পরিবর্তে চিকিৎসা ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের উপসর্গ, কারখানার বায়ুর মান, তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এবং কোনো রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি ছিল কি না, সেসব বিষয়ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

একসঙ্গে অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের অসুস্থতা এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশে এর আগেও ঘটেছে। চলতি বছরের মে মাসে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় ৫০ জনের বেশি শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় হাসপাতালের একজন চিকিৎসক সেটিকে ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অর্থাৎ দৃশ্যমান কোনো বিষাক্ত উৎস ছাড়াও ভয়, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপের প্রভাবে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত শারীরিক উপসর্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে আদমজীর বর্তমান ঘটনাকে এখনই একইভাবে ব্যাখ্যা করার মতো চিকিৎসাবিষয়ক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের মধ্যে ভূতের গল্প কিংবা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে বলে তাদের অসুস্থতাকে নিছক কুসংস্কার হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া অতিপ্রাকৃত কারণকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করাও দায়িত্বশীল হবে না।

শনিবার শতাধিক নারী শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইউএনবির প্রতিবেদনেও শতাধিক নারী শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে সে সময় অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। আক্রান্তদের বেপজা মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পরদিন সকালে কর্মীরা কাজে ফিরলেও আগের দিনের ঘটনা তাদের মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলেছিল বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা করা যায়। কয়েকজন আবার অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কর্মীদের নিরাপত্তা এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার স্বার্থে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ। একই ভবনের নির্দিষ্ট কয়েকটি তলায় প্রথম দফায় অসুস্থতা শুরু হওয়ার কারণে সেখানে বাতাস চলাচল, তাপমাত্রা কিংবা অন্য কোনো পরিবেশগত সমস্যা ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। যদিও বেপজা কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে শ্বাসরোধ বা দমবন্ধ হওয়ার মতো দৃশ্যমান কিছু পাওয়া যায়নি।

অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার পাশাপাশি এখন তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ভয় দূর করাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সেটি কর্মীদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষত সহকর্মীদের একের পর এক অসুস্থ হতে দেখলে অন্যদের মধ্যেও ভয়, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা ছাড়া আদমজীর শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এমন কোনো রোগ নির্ণয় করা হয়নি। ফলে অসুস্থতার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই যৌক্তিক।

আদমজী ইপিজেডের মতো একটি বড় শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর সামনে এলে কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।

বিশেষ করে কারখানার অভ্যন্তরীণ বায়ুর মান, তাপমাত্রা, বৈদ্যুতিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ এবং পানীয় জলসহ সম্ভাব্য প্রতিটি উৎস পরীক্ষা করলে অসুস্থতার বাস্তব কারণ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে শ্রমিকদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগও জরুরি। কর্তৃপক্ষ কী পরীক্ষা করছে, অসুস্থ সহকর্মীদের অবস্থা কেমন এবং কর্মক্ষেত্রে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি পাওয়া গেছে কি না—এসব তথ্য নিয়মিত জানানো গেলে গুজবের জায়গা সংকুচিত হতে পারে।

আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, কারখানায় কথিত ‘ভূতের’ উপস্থিতির কোনো প্রমাণ মেলেনি। শ্রমিকদের অসুস্থ হওয়ার প্রকৃত কারণও এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে ঘটনাটিকে অতিপ্রাকৃত কোনো বিষয়ের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করার সুযোগ নেই।

টানা দুই দিনের অসুস্থতার ঘটনায় অবশ্য কারখানাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয় এবং অনিশ্চয়তা। কর্তৃপক্ষ একদিনের ছুটি দিয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দিলেও মূল প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—কেন একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন?

সেই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর মিলবে চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং কর্মপরিবেশের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। ততক্ষণ পর্যন্ত গুজব কিংবা ‘ভূত আতঙ্কের’ বদলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত