সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই: আইনমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক কিংবা সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতার সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, এই সংকট মোকাবিলায় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘রোহিঙ্গা সংকট: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। বাংলাদেশ মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকেই নিতে হবে।

বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তার মতে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও সরকার কূটনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করছে না। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুকে রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে জনগণকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। তার বক্তব্যে জাতীয় ঐকমত্যকে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

২০১৭ সালের আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়েও রোহিঙ্গারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসেছিল। ফলে প্রায় এক দশক ধরে এই সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি আসেনি।

এমন বাস্তবতায় আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নন এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীও নন। তবে তারা মানুষ এবং তাদের মানবাধিকার রয়েছে। নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তারা মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার এই বক্তব্যে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের দ্বিমুখী বাস্তবতার একটি চিত্র পাওয়া যায়। একদিকে রয়েছে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, সীমিত সম্পদ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ এবং সীমান্ত পরিস্থিতি। অন্যদিকে রয়েছে নিপীড়নের শিকার একটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক ও মানবিক দায়।

আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতার বিষয়টিও সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার নিশ্চিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের অবস্থান স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। আইনমন্ত্রীও বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় ঐকমত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় সেখানে ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। ফলে শুধু সীমান্ত পার করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নয়, প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিও সমাধানের অপরিহার্য অংশ।

আইনমন্ত্রী এই জায়গায় আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্ব সামনে এনেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় দেশটির সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সংকটের স্থায়ী সমাধানের মূল দায়িত্বও মিয়ানমারের।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছেন বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময় যেভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এগোতে চায়।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। গত জুলাইয়ে আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান টেকসই সমাধানের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সংলাপ, বহুপাক্ষিকতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও এর প্রভাব রয়েছে। ফলে সংকট সমাধানে মিয়ানমারের দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তাও ক্রমে বাড়ছে।

রোববারের আলোচনায় আইনমন্ত্রী গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও কার্যকর সুপারিশ চেয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকটের সামাজিক, মানবিক, কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এসব সুপারিশ সরকারের নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন।

নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম. হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। সূচনা বক্তব্য দেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহম্মেদ।

আলোচনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা, দ্য ডেইলি স্টারের কূটনৈতিক প্রতিবেদক পরিমল পালমা, রোহিঙ্গা নারী অধিকারকর্মী রাজিয়া সুলতানা এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মোহাম্মদ ঈসা ইবনে বেলাল অংশ নেন।

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি হবে কখন। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই মানবিক উদ্যোগ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণে বাংলাদেশের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি দায়িত্ব রয়েছে। নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে—জাতীয় নিরাপত্তা, মানবিক দায়িত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধান। তবে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের বাস্তবতায় এসব নীতিগত অবস্থান কতটা কার্যকর ফল এনে দিতে পারে, সেটি নির্ভর করবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয়তার ওপর।

একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে রোহিঙ্গা প্রশ্নে একটি জাতীয় অবস্থান গড়ে তোলার আহ্বানও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রভাবও তত বিস্তৃত হচ্ছে।

মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া মানুষগুলোর অধিকার রক্ষা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করতে হবে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই পথচলায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত