প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নরওয়ের দীর্ঘদিনের রাজা হারাল্ড পঞ্চম আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে রাজধানী অসলোর জাতীয় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে শান্তিপূর্ণভাবে তার মৃত্যু হয় বলে রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে তার বিদায়ে নরওয়েতে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে রাজা হারাল্ডের জনসম্মুখে উপস্থিতি কমে এসেছিল। সম্প্রতি বিরল রক্তরোগ হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তার ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকন রিজেন্ট হিসেবে রাজার দায়িত্ব পালন করছিলেন।
রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নরওয়ের রাজতন্ত্রে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন ছেলে হাকন। বাবার অসুস্থতার সময় সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করায় রাজকীয় কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতাও ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন তিনি।
১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অসলোর কাছে স্কাগুমে জন্মগ্রহণ করেন হারাল্ড। তার শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে। নাৎসি জার্মানি নরওয়ে আক্রমণ করলে নিরাপত্তার জন্য তিনি মায়ের সঙ্গে দেশ ছেড়ে প্রথমে সুইডেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। যুদ্ধ শেষে পরিবারের সঙ্গে নরওয়েতে ফিরে আসেন তিনি। এরপর শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।
১৯৫৭ সালে হারাল্ড ক্রাউন প্রিন্স হন। দীর্ঘ সময় রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি তার বাবা রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর নরওয়ের সিংহাসনে বসেন তিনি। এরপর টানা ৩৫ বছর রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হারাল্ডের রাজত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রাজপরিবারকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা। ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় রীতিনীতির কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনে তিনি তুলনামূলক আধুনিক ও উদার রাজতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেন। সাধারণ পরিবারের মেয়ে সোনিয়া হারাল্ডসেনকে বিয়ে করাও নরওয়ের রাজপরিবারের প্রচলিত ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৮ সালে সোনিয়া হারাল্ডসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন হারাল্ড। প্রায় ৫৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে তারা নরওয়ের রাজপরিবারের অন্যতম পরিচিত দম্পতিতে পরিণত হন। তাদের সংসারে ছেলে হাকন ও মেয়ে প্রিন্সেস মার্থা লুইস রয়েছেন। তাদের রয়েছে ছয় নাতি-নাতনি।
রাজা হারাল্ডের ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংকটের সময় জনগণের পাশে দাঁড়ানো। ২০১১ সালে নরওয়েতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তার দেওয়া বক্তব্য দেশটির মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সেই সংকটময় সময়ে তিনি বিভাজনের বদলে ঐক্য, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর জোর দেন। তার বক্তব্যের মাধ্যমে নরওয়ের বহুত্ববাদী সমাজের প্রতি সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতিগত পরিচয় এবং যৌন বৈচিত্র্যের মতো সামাজিক বিষয়েও হারাল্ড তুলনামূলক উদার অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। নরওয়ের পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থার সঙ্গে রাজতন্ত্রকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে তার এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।
রাজপরিবারের বাইরেও পরিবেশ ও খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা ডব্লিউডব্লিউএফের নরওয়ে শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি এবং দীর্ঘ সময় সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরিবেশগত বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতেও তিনি বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও রাজা হারাল্ড ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি দক্ষ নাবিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তিনবার অলিম্পিকে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি খেলাধুলার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা তাকে নরওয়ের মানুষের কাছে আরও পরিচিত করে তুলেছিল।
পরিবারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে তার উদার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া গেছে। ২০০১ সালে ছেলে হাকনের স্ত্রী মেটে-মারিতের আগের সম্পর্কের সন্তান মারিয়ুসকে রাজপরিবার আপন করে নেয়। যদিও মারিয়ুস আনুষ্ঠানিকভাবে রাজপরিবারের সদস্য নন, তাকে পরিবারে গ্রহণ করার বিষয়টি নরওয়ের রাজপরিবারের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে রাজা হারাল্ডকে নিজের পরিবারের পাশাপাশি নরওয়ের রাজতন্ত্রকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্কের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্যকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে মেটে-মারিতের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হোইবিকে ঘিরে গুরুতর আইনি বিষয় এবং মেটে-মারিতের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টেইনের যোগাযোগ নিয়ে বিতর্ক বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
এসব ঘটনায় নরওয়ের রাজপরিবারের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এক পর্যায়ে রাজপরিবারের প্রতি সমর্থন ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৫৪ শতাংশে নেমে আসার তথ্যও সামনে এসেছে। তবে রাজা হারাল্ডকে এসব বিতর্কের জন্য সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেননি দেশটির জনগণ। বরং তার দীর্ঘ রাজত্ব, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সংকটের সময়ে জনগণের পাশে থাকার ভূমিকার কারণে তার প্রতি আলাদা শ্রদ্ধা বজায় ছিল।
স্বাস্থ্যগত কারণে ২০২৪ সালের এপ্রিলের পর থেকে রাজা হারাল্ডের জনসম্মুখে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় তাকে একাধিকবার চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তবু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে যতটা সম্ভব সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। অসুস্থতার সময় তার ছেলে হাকন ধীরে ধীরে রাজকীয় দায়িত্বের বড় অংশ সামলাতে শুরু করেন।
হারাল্ডের মৃত্যুর পর এখন নরওয়ের সিংহাসনের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে হাকনের হাতে যাওয়ার পথ তৈরি হলো। দীর্ঘদিন ধরে ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে প্রস্তুতি নেওয়া হাকনের জন্য এটি একই সঙ্গে দায়িত্ব ও উত্তরাধিকারের বড় পরীক্ষা। বাবার জনপ্রিয়তা, আধুনিক রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তি এবং সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রভাব—সবকিছুর মধ্যেই তাকে নরওয়ের রাজপরিবারের নেতৃত্ব দিতে হবে।
রাজা হারাল্ডের জীবন ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে আধুনিক নরওয়ের পরিবর্তন পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ যাত্রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শৈশবেই দেশ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। পরে সেই দেশেই ফিরে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, রাজপরিবারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন দশক রাষ্ট্রের সাংবিধানিক রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার রাজত্বে নরওয়ের রাজতন্ত্র ধীরে ধীরে আরও মানবিক, আধুনিক ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য রূপ পেয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতে সমঝোতা ও সংলাপকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সমাজের পরিবর্তনশীল মূল্যবোধের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রবণতা তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।
৮৯ বছর বয়সে তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে তাই শুধু একজন রাজার মৃত্যু হয়নি; নরওয়ের আধুনিক রাজতন্ত্রের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটেছে। এখন তার উত্তরসূরি হাকনের সামনে সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন সময়ের প্রত্যাশার সঙ্গে রাজপরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব।