স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা, চিন্তিত স্পিকার

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩২ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলের সদস্যদের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন। এ নিয়ে হইচই ও হট্টগোলে একপর্যায়ে সংসদে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার বিরোধী দলের সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার আহ্বান জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরে তিনি সংসদের কার্যপ্রণালী ও পারস্পরিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ঘটনার সূত্রপাত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের একটি সম্পূরক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কী।

প্রশ্নের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রথম এক মিনিট তিনি অমনোযোগী ছিলেন। তাই প্রশ্নটি আবার করার অনুরোধ করেন। শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্নটি পুনরায় করলে জবাব দিতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। অনেকে নিজ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। সংসদে হইচই ও হট্টগোল শুরু হয়।

পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ্য করে ওই মন্তব্য করেননি। এরপরও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকলে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।’

একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য প্রত্যাহার করার কথা জানান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন এবং হট্টগোলের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একসময় বসে পড়েন।

এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি।’ ওই বক্তব্য নিয়েও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। তবে শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার বিরোধী দলের সদস্যদের বসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সবাইকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে এবং মাইক্রোফোনে বক্তব্য দিলে তা সংসদের সবাই শুনতে পারবেন।

স্পিকার আরও বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছা মতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।’ তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার আহ্বান জানান।

হট্টগোলের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করলে স্পিকার তাকে তার দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি কি না। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে বিরোধী দলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে বা কোথায় আসামি গ্রেপ্তার হয়নি—এসব ঢালাওভাবে না বলে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা উচিত।

‘উনি নিজেকে কী মনে করেন’

এরপর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন স্পিকার। শুরুতেই তিনি বলেন, তাকে আগে সুযোগ দেওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে পারতেন।

সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের সময় মন্তব্য করলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।’

স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, তার বক্তব্যের সময় এভাবে মন্তব্য করা ‘অশুভ’। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশন শুরুর দিন থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।’ তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় রাখার কথা বলেছেন।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই।’ তিনি পরামর্শ দেন, শিক্ষকতা করতে হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পারেন, সেখানে যার ইচ্ছা ভর্তি হয়ে তার বক্তব্য শুনতে পারবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম’ আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, এ ধরনের আচরণ সংসদীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ এবং তার বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।

বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।

‘আমি সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত’

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সবাই কাজ করছেন। তবে কার্যপ্রণালির বিধি অনুসরণ না করা হলে সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সংসদে প্রত্যেক সদস্যের কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু একে অপরকে কথা বলতে বাধা দেওয়ার প্রবণতা সংসদের জন্য ভালো নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা করে অসংসদীয় কোনো শব্দ বা বক্তব্য থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার আশ্বাস দেন স্পিকার। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, কথা বলার স্বাধীনতা যেন অন্যের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়।

তিনি বলেন, সরকারি দলে বিরোধী দলের চেয়ে সংখ্যায় বেশি সদস্য রয়েছেন। তাই হইচই করে কারও বক্তব্য স্তব্ধ করা যাবে না। সংসদ পরিচালনায় সহযোগিতা করার জন্য তিনি সব সদস্যের প্রতি আহ্বান জানান।

এরপর বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তিনি সংসদকে কোনো পক্ষের সংখ্যার ভিত্তিতে বিভক্ত করার পক্ষে নন। ভালো কাজে সবাই একসঙ্গে কাজ করবেন এবং অন্যায় হলে প্রতিবাদ করবেন—এমন অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সবশেষে স্পিকার বলেন, ‘আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।’ তিনি জানান, সেদিন যেভাবে একে অপরকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।

স্পিকার বলেন, অনেক কষ্টের পর দেশে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সংসদের প্রতিটি সদস্যের। সংসদে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক বক্তব্য শোনা এবং সংসদীয় বিধি মেনে চলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত