নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন বৃহস্পতিবারের মধ্যে?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন বৃহস্পতিবারের মধ্যে?

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে আবারও গতি তৈরি হয়েছে। আগামী সোমবার, ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে পরবর্তী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষা ও প্রত্যাশা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির ব্যবধানের কারণে নতুন পে স্কেলকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সরকারি কর্মচারীরা। তবে চূড়ান্তভাবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে এবং ভাতা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন আগামী সপ্তাহের মধ্যেই জারি হতে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা চূড়ান্ত খসড়ায় সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ও ভাতা কত শতাংশ বাড়ছে, সে বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। ফলে নতুন কাঠামোতে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র জানতে সরকারি কর্মচারীদের আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এর আগে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় তা ঘোষণা করা হতে পারে। তার এমন বক্তব্যের পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়।

এরও আগে ২৯ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে কাজ চলছে। কাজ শেষ হওয়ার পর বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পরে তাদের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রিসভায় এখন যে প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে, তার পেছনে এই কমিটির সুপারিশও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এটি একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে দুই ধাপে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতন বাড়ানো এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে বেতন-ভাতা আরও বেশি হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন এ বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিশনের সুপারিশে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ ছিল।

তবে কমিশনের সুপারিশ এবং সচিব কমিটির পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত বেতন কাঠামোয় কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিই এখন সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন কত নির্ধারণ করা হবে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা কতটা বাড়ানো হবে এবং নতুন কাঠামো পুরোপুরি একসঙ্গে নাকি ধাপে ধাপে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আর্থিক প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার ও পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোকে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সরকারি ব্যয়ের সামগ্রিক কাঠামোতেও এর প্রভাব পড়বে।

অর্থমন্ত্রী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এই সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে ১ জুলাই থেকে কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন এখনো না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। যদি আগামী সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া যায় এবং বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তাহলে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে যাবে।

নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের নিয়মিত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, পেনশনসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ওপরও আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সময়ে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং সরকারি চাকরিতে আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে আগামী সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রস্তাব অনুমোদন পেলে পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির পথ খুলে যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বেতন ও ভাতার হার, কার্যকরের পদ্ধতি এবং অন্যান্য শর্ত কী হবে, তা নিশ্চিত হবে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত